
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়নের পাড়িয়ালী ও হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচকাটিয়া গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ‘বড় খাল’-এর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ না হওয়ায় অন্তত ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নির্ধারিত সময় পার হয়ে এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেতুটির মাত্র অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মণিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (সিএএফডিআরআইআরপি)-এর আওতায় নেহালপুর ইউপি–হাজিরহাট বাজার হয়ে কুলটিয়া ইউপি সড়কের বড় খালের ওপর ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি আরসিসি গার্ডার সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২ টাকা ৮১ পয়সা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ পায় সাতক্ষীরার পলাশপোলের ঠিকাদার ইকবাল জমাদার। ২০২৪ সালের ১ মে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা সম্পন্ন হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, হরিদাসকাটি ইউনিয়নের হাজিরহাট থেকে দক্ষিণমুখী সড়ক ধরে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এগোলেই বড় খালের ওপর নির্মাণাধীন সেতুটি। খালের দুই পাশে নতুন কংক্রিটের পিলার নির্মাণ করা হলেও মাঝখানে পুরোনো সেতুর ভাঙা অংশ এখনো রয়ে গেছে। চলাচলের সুবিধার্থে নির্মাণাধীন সেতুর পূর্ব পাশে কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে একটি অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়েছে, যা বর্তমানে নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, প্রতিদিন অন্তত ২০টি গ্রামের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় পথচারী, ভ্যান, মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই যানবাহন ঠেলে বা টেনে অস্থায়ী সেতু পার হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতার কারণে কাঠের সেতুটি পানিতে তলিয়ে গেলে যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদার কয়েকদিন কাজ করে আবার দীর্ঘ বিরতি দেন। এভাবে দুই বছর পার হলেও কাজের অর্ধেকও শেষ হয়নি।
পদ্মনাথপুর গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুল আজিজ মোড়ল (৭০) বলেন, “দুই বছর ধরে একটু একটু করে কাজ হচ্ছে। কাঠের নড়বড়ে সেতু দিয়ে ভ্যান পার করতে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীও ঠিকমতো পাওয়া যায় না।”
ডাঙ্গা মহিষদিয়া গ্রামের ঘাট শ্রমিক রোস্তম সরদার (৫০) বলেন, “শুকনো মৌসুমে কষ্ট করে চলাচল করা গেলেও বর্ষায় একেবারেই যাতায়াত করা যায় না।”
পাঁচবাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক ভুপতি রায় (৬৫) বলেন, “যাত্রী নামিয়ে ভ্যান টেনে কাঠের সেতু পার করতে হয়। সেতুর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগের শেষ নেই।”
হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক দেবদাস রায় (৪৬) বলেন, “এই সড়ক দিয়ে চলাচলে সময় ও দূরত্ব দুটোই কম লাগে। কিন্তু দুই বছর ধরে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় ভোগান্তির মধ্যে আছি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার ইকবাল জমাদার প্রথমে বলেন, তিনি মসজিদে আছেন, পরে কথা বলবেন।
মণিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ভবদহ এলাকার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বছরে প্রায় ছয় মাস কাজ করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে সেতুর ঢালাইয়ের জন্য শাটারিং বসানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি পুরোনো সেতুর অবশিষ্ট অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্লাব নির্মাণ শেষ হলে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হবে। চলতি বছরের মধ্যেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, চলাচলের জন্য ব্যবহৃত অস্থায়ী কাঠের সেতুটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় ঠিকাদারকে দ্রুত এটি মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরে ঠিকাদার ইকবাল জমাদার বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে পানি সেচে কাজ করতে হওয়ায় নির্মাণকাজে বিলম্ব হয়েছে। পুরোনো সেতু অপসারণের কাজ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শেষ হবে। এরপর স্লাব নির্মাণ শুরু করা হবে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের সময় রয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ করার আশা করছেন তিনি। পাশাপাশি দুই দিনের মধ্যে অস্থায়ী কাঠের সেতুটি মেরামত করা হবে বলেও জানান।
মন্তব্য করুন