
ভোরের আলো ফুটতেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ। এরপর হাজার হাজার পাখির সম্মিলিত কিচিরমিচির আর কলতানে ঘুম ভাঙে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের নিভৃত আশুরহাট গ্রামের মানুষের।
শুধু মেহগনি, শিমুল আর দেবদারু গাছের ডালই নয়, ড্রোনের ক্যামেরায় উপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটি সবুজ অরণ্য ঢেকে গেছে সাদা শামুকখোল, কালো পানকৌড়ি এবং সারসের শুভ্র চাদরে। দলবেঁধে ওড়াউড়ি, ছানাদের খাওয়ানো আর জলকেলি; এমন চোখ জুড়ানো দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন বহূ প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থী।
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে আশুরহাট গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের আবদুর রাজ্জাক এবং গোপাল বিশ্বাসের দুটি পুকুরপাড়ের গাছগুলো এখন পাখিদের স্বর্গরাজ্য। আকাশে ডানা মেলার নান্দনিক ভঙ্গিমা আর গাছের মগডালে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা হাজারো শামুকখোলের এই রূপ যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাস। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে এই গ্রামটিকে নিজেদের নিরাপদ আবাসস্থল বানিয়ে নিয়েছে পরিযায়ী ও দেশীয় পাখিরা। বছরে প্রায় নয় মাসই এই গ্রাম মুখরিত থাকে পাখিদের কোলাহলে। প্রচন্ড শীতের সময়টুকুতে তারা সাময়িকভাবে অন্যত্র চলে গেলেও শীত কমতেই আবার ফিরে আসে আপন কুলায়। এখানে তারা বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং ছানা (বাচ্চা) ফোটায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী নৃপেন কুমার বিশ্বাস জানান, দীর্ঘ প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে হাজার হাজার পাখি এখানে থাকছে। পাখিগুলো এই গ্রামের আবদুর রাজ্জাক ও গোপাল বিশ্বাসের দুটি পুকুরপাড়ে থাকা গাছগুলোতে আবাসস্থল হিসেবে রয়েছে। এসব পাখি এখানের গাছগুলোতে বাসা বাধে, ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফোটায়। ফলে বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাখির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। যখন পাখির বাচ্চা ফোটে তখন তাদের কিচিরমিচির শব্দে গোটা এলাকা মূখরিত হয়ে ওঠে। এসব পাখি এই গ্রামটিকে ‘পাখির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। নৃপেন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বেশি শীত পড়লে এখান থেকে পাখিরা অন্যত্র চলে যায়। পরে শীত কমলে আবার ফিরে আসে। বছরে নয় মাসই পাখিগুলো এখানেই থাকে। স্থানীয়রা পাখি শিকার করেন না। বরং তারা পাখিদের পাহারা দিয়ে থাকেন।’
পাখিদের সুরক্ষায় ২০১৭ সালে স্থানীয় উদ্যোগে গঠিত হয় ২০ সদস্যের ‘আশুরহাট পাখি সংরক্ষণ সমিতি’। সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক জানান, চলতি বছরে এখানে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার পাখি আশ্রয় নিয়েছে। সামনের মাসে আরো পাখি আসবে বলে জানান তিনি। চোরা শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করা, অসুস্থ পাখির যত্ন নেয়া; সবই সমিতির সদস্যা করেন।
মাগুরার মহম্মদপুর থেকে আসা দর্শনার্থী খুরশিদ আলম সোহাগ মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, “লোকমুখে শুনে এখানে এসেছি। একসঙ্গে এত পাখি সচরাচর দেখা যায় না। তবে এই স্থানটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, এলাকাটিকে দ্রুত সরকারিভাবে ‘পাখিদের অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হোক। পুকুরসহ সংশ্লিষ্ট জমি সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করে বা মালিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে যদি একটি পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তবে যেমন রক্ষা পাবে এই হাজারো নিরীহ পাখির প্রাণ, তেমনি ঝিনাইদহ জেলাও পাবে এক নতুন পর্যটন সম্ভাবনা। প্রশাসনের উদাসীনতা কাটিয়ে আশুরহাটের পাখিরা ফিরে পাক স্থায়ী নিরাপত্তা; এমনটাই এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন