
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মৌশা মোহাম্মাদিয়া (স.) দাখিল মাদরাসার চিত্র যেন দেশের গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের এক জরাজীর্ণ, নাজুক, হাতাশাজনক ও উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে সরেজমিনে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কখনো ১৮, কখনো ১৫, আবার কোনো দিন নেমে আসছে মাত্র আট জনে। অর্থাৎ অনেক দিনই প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যার চেয়েও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকছে কম। অথচ এমপিওভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে প্রতি মাসে সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হচ্ছে তিন লক্ষাধিক টাকা।
রোববার (২১ জুন) দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে মৌশা মোহাম্মাদিয়া (স.) দাখিল মাদরাসায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৯ জন ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত রয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাঁচ জন, সপ্তম শ্রেণিতে দুই জন, অষ্টম শ্রেণিতে ছয় জন এবং দশম শ্রেণিতে ছয় জন শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়।
এর আগে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার (১৭ ও ১৮ জুন) টানা দুই দিন প্রতিষ্ঠানটিতে চালানো অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর ও হতাশাজনক তথ্য। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং নবম শ্রেণির কোনো পাঠদানই হচ্ছে না। অনুসন্ধানের তিন দিনেই এই শ্রেণিগুলোতে একজন শিক্ষার্থীরও দেখা মেলেনি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রায় দেড় মাস আগে ঝড়ে মাদরাসার টিনশেডের দুইটি ঘর ভেঙে যাওয়ায় তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট দেখা দিয়েছে। আর এই অজুহাতে প্রথম থেকে পঞ্চম ও নবম শ্রেণির নিয়মিত পাঠদান কার্যত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
তবে সচল থাকা বাকি শ্রেণিগুলোর অবস্থা আরও করুণ ও উদ্বেগজনক। গত বুধবার সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির পাঠদান চলাকালে মোট ১৫ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়। যার মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিন জন, সপ্তম শ্রেণিতে তিন জন, অষ্টম শ্রেণিতে চার জন এবং দশম শ্রেণিতে পাঁচ জন ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে সেই সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনকভাবে কমে নেমে আসে মাত্র আট জনে। এদিন ষষ্ঠ শ্রেণিতে মাত্র একজন, সপ্তম শ্রেণিতে মাত্র দুই জন, অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র দুই জন এবং দশম শ্রেণিতে মাত্র তিন জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। অথচ প্রতিষ্ঠানের দৈনিক হাজিরা খাতায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাস্তব চিত্রের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
মাদরাসার অফিশিয়াল রেজিস্ট্রারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে ৩০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ২৭ জন, পঞ্চম শ্রেণিতে ২৫ জন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৩৫ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৪০ জন, নবম শ্রেণিতে ৩৫ জন এবং দশম শ্রেণিতে ২৫ জনসহ মোট ৩২২ জন শিক্ষার্থী কাগজ-কলমে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলনই নেই।
অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হাফেজি ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে রাখা হয়েছে। তারা মাঝে মধ্যে এসে হাজিরা দেয়। গত বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে নিখড়হাটা হাফেজি মাদরাসার সোয়াইফ ও আনোয়ার নামে দুই শিক্ষার্থীকে এই মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাসে অংশ নিতে দেখা যায়। সোয়াইফ নিখড়হাটা গ্রামের মো. মহিদুলের ছেলে এবং আনোয়ার বলরামপুর গ্রামের মো. নান্নু মোল্যার ছেলে। প্রায়দিনই এরকম শিক্ষার্থী এখানে ক্লাস করে। বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও অকপটে স্বীকার করেছেন।
শিক্ষার্থী ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের পাশাপাশি মাদরাসার অবকাঠামোগত অবস্থাও চরম নাজুক। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮৭ সালের পয়লা জুলাই এমপিওভুক্ত হওয়া এই মাদরাসাটিতে বর্তমানে রয়েছে একটি জরাজীর্ণ একতলা ভবন। ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। ঝড়ে বিধ্বস্ত ঘর দুইটির কাঠ, খুঁটি এবং ভাঙাচোরা বেঞ্চগুলো এখন সচল জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে। ফলে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক কক্ষেই বিরাজ করছে এক ভুতুড়ে পরিত্যক্ত নীরবতা।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১১ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী কর্মরত থাকলেও সুপার, সহকারী সুপার, তিন জন সহকারী মৌলভী, এক জন এবতেদায়ী প্রধান, এক জন সহকারী শিক্ষক এবং দুইজন কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে।
যেখানে অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা, অধিকাংশ শ্রেণিতেই নিয়মিত পাঠদান বলতে কিছুই নেই এবং সরকারের লাখ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও শিক্ষার মান নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অতি দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. তৈয়েবুর রহমান বলেন, “বিধি মোতাবেকই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তবে ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে, বিশেষ করে এক-দেড় মাস আগে ঝড়ে দুইটি টিনশেড ঘর ভেঙে যাওয়ার পর কয়েকটি শ্রেণির ক্লাস নিয়মিত নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. কবির হোসাইন বিষয়টিকে আড়াল না করে বলেন, “তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থী কম, এটা সত্য। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা নতুন করে কাজ করছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হোসনে মোবারক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “বিষয়টি আমাদের দাপ্তরিক নোটিশে বা কাগজপত্রে ছিল না। সরেজমিনের এই তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অতি দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মন্তব্য করুন