
পর্তুগালের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ড্র করে ইতিহাস গড়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। ইয়োয়ান উইসার সমতাসূচক গোলের সুবাদে ম্যাচ থেকে মূল্যবান এক পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। এমনকি ইবোলা মহামারিতে বিপর্যস্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়াতেও মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় সংকটের বাস্তবতা।
ডিআর কঙ্গো ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে ‘জায়ার’ নামে অংশ নিয়েছিল। তবে সেই আসরে কোনো গোল করতে পারেনি দলটি। বরং তিন ম্যাচে হজম করেছিল ১৪ গোল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে শুধু গোলই নয়, অর্জন করেছে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম পয়েন্টও।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ইয়োয়ান উইসার গুরুত্বপূর্ণ গোল ডিআর কঙ্গোকে এনে দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই অর্জন দেশটির ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ম্যাচ শুরুর আগে বেশিরভাগ ফুটবল বিশ্লেষকই ধারণা করেছিলেন, পর্তুগালের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারতে পারে কঙ্গো। কারণ প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ একঝাঁক অভিজ্ঞ ও তারকাখচিত ফুটবলার।
কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সব হিসাব বদলে দেয় কঙ্গোর ফুটবলাররা। আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছ থেকে এক পয়েন্ট আদায় করে নেয় এবং কোটি সমর্থককে আনন্দে ভাসায়।
ম্যাচ শেষে ডিআর কঙ্গোর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে গর্বিত কণ্ঠে বলেন, 'ছেলেরা কঙ্গোকে বিশ্বমঞ্চে দারুণভাবে তুলে ধরেছে। পুরো দেশটার এই আনন্দ প্রাপ্য ছিল।'
কোচের এই কথার সত্যতা মিলল দেশটির ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়াতে। এই অঞ্চলটিই কঙ্গোর ইবোলা মহামারীর মূল ধাক্কাটা সামলাচ্ছে।
সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কঙ্গো ও উগান্ডা মিলিয়ে এই রক্তক্ষরণকারী জ্বরে এখন পর্যন্ত ৮৩৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মারা গেছেন ১৯৬ জন। এর মধ্যে কেবল বুনিয়াতেই ২১৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সেখানে পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত থাকায় ঠিক কতজন আসলে আক্রান্ত তা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না।
এই চরম সংকটের মধ্যেও টেলিভিশনের সামনে বসে বিশ্বকাপ দেখাটাই ছিল বুনিয়াবাসীর একমাত্র মানসিক স্বস্তি। তাদের আনন্দের উপলক্ষ দেন নিউক্যাসলের হয়ে খেলা উইসা। তার গোলের পর রাজপথ মেতে ওঠে বাঁধভাঙা উল্লাসে।
জীর্ণ দোকানগুলোর সামনে জটলা পাকানো তরুণেরা দুই হাত উঁচিয়ে লাফাতে শুরু করে, তাদের চোখে-মুখে তখন খেলা করছিল আনন্দের ঝিলিক। এর সঙ্গে যোগ হয় মোটরবাইকের নানারকম কসরত আর তীব্র হর্ন, যা মুহূর্তেই তীব্রতায় রূপ নেয়।
ইবোলার সংক্রমণ ঠেকাতে মে মাসের শেষদিকে যেকোনো জমায়েতে সর্বোচ্চ ৫০ জনের সীমা বেঁধে দিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু এই আনন্দের দিনে বারের উপচে পড়া ভিড়ের সামনে সেই নিয়ম খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।
উচ্ছ্বসিত আন্তোয়ানেত মাকাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘নিজের দেশের পক্ষে গলা ফাটাতে পারাটা একটা গর্বের বিষয়।’ তবে সামাজিক দূরত্বের বালাই না থাকায় কিছুটা শঙ্কাও ছিল তার মনে। তিনি যোগ করেন, ‘বাড়ি ফিরেই আগে নিজেকে ভালোমতো জীবাণুমুক্ত করতে হবে।’
পর্তুগালের বিপক্ষে ড্র শুধু একটি ফুটবল ফল নয়, বরং সংকটময় সময়ে ডিআর কঙ্গোর মানুষের জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইবোলা মহামারী, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও জাতীয় দলের এই সাফল্য দেশবাসীকে দিয়েছে এক বিরল আনন্দের উপলক্ষ এবং জাতীয় গৌরবের নতুন গল্প।
মন্তব্য করুন