
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, ইরানকে দুর্বল করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের তুলনায় ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংকট ছিল ভিন্নধর্মী।
তাদের দাবি, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বহাল থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরির প্রচেষ্টাও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ, জনপ্রিয়তার হার কমে যাওয়া এবং রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে বিরোধিতা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অস্থিরতাও ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত রাজনৈতিক সাফল্য অর্জনের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথ বেছে নেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
চুক্তির পর ইসরাইলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ইসরাইলের আঞ্চলিক কৌশলকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে।
কিছু পর্যবেক্ষক দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতির কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন সমর্থন ইসরাইলের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ওয়াশিংটনের অবস্থান পরিবর্তন দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইসরাইলের ডানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আরও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানকে মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণের দাবি তুলেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা।
চুক্তির পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও তেহরান তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ ইরানের সঙ্গে সমঝোতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে কৌশলগত চাপে পড়লে ইসরাইল গাজায় সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে।
তবে তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরও গাজার সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ফলে শুধুমাত্র সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান অর্জন কঠিন হতে পারে।
এছাড়া গাজায় নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে একদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্যদিকে ইসরাইলকে তার ভবিষ্যৎ কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
মন্তব্য করুন