
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
পরিবারের দাবি, গত ৪ জুলাই বিকেলে বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে বের হওয়ার পর শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে শুরুতে পুলিশ অভিযোগ নিতে গড়িমসি করেছে বলেও পরিবারের অভিযোগ।
স্থানীয়দের সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে কয়েকজনের সঙ্গে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়। পরে ওই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় অপহরণ ও হত্যা মামলা দিতে গেলেও পুলিশ নেয়নি বলে ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ। অভিযুক্তদের ধরে এলাকাবাসী থানায় সোপর্দ করে আসলেও বিজেপি নেতারা ধর্ষকদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।
এ ঘটনা পর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে কলকাতা। মুসলিম শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি পশ্চিমবঙ্গে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আর এ আন্দোলন দমতে তড়িঘড়ি করে মঙ্গলবার রাতে মূল আসামিকে এনকাউন্টারে হত্যা করে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন।
এই ইস্যুতে কলকাতায় আন্দোলন তুঙ্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতাসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখনই গদি বাঁচাতে রাতারাতি ধর্ষককে ধরে এনে এনকাউন্টারের নাটক সাজালো শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন।
মঙ্গলবার রাতে পুলিশ জানায়, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পাল্টা গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর বারুইপুরসহ কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দোষীদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানায়।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ঘিরে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দাবির অনেকগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে।
বারুইপুর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, এক ব্যক্তি আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, মৃতদেহটি কোথায় রয়েছে।
তার দেখানো জায়গা থেকে বস্তাবন্দি নাবালিকার মরদেহ উদ্ধার হতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। মারধর শুরু হয় ওই ব্যক্তিকে। ঘটনাচক্রে দেখা গিয়েছে, ওই ব্যক্তিই এই ধর্ষণ এবং খুন কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল।
মঙ্গলবার রাতেই পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় প্রভাসের। মঙ্গলবার রাতে তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ জানায়, সেই সময় পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান প্রভাস।
পুলিশের পাল্টা গুলিতে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। বারুইপুর কাণ্ডে প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রভাসই।
গত শনিবার বন্ধুর জন্মদিনে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা। তার পর থেকে তার আর খোঁজ মেলেনি। তার খোঁজ করার সময় এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ। সেই সময় ওই নাবালিকাকে এক যুবকের সঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়।
নীল টি-শার্ট এবং লাল টুপি পরা ওই যুবকের খোঁজ শুরু হয়। সেই সূত্র ধরে পুলিশ ওই যুবককে শনাক্ত করে। তার পরই গ্রেফতার হন প্রভাস। তাকে জেরা করে আরও তিন অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয় আরও এক যুবককে।
প্রভাসের বাড়ি সূর্যপুর এলাকাতেই। স্থানীয় সূত্রে খবর, পরিবারে মা, বাবা, স্ত্রী এবং এক পুত্রসন্তান রয়েছে। প্রভাসের বাবা অসুস্থ। মা গৃহবধূ। স্ত্রী পরিচারিকার কাজ করেন।
তবে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় প্রভাসের নাম জড়ানোর পর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান প্রভাসের স্ত্রী। বাড়িতে প্রভাসের মা এবং বাবা রয়েছেন।
পুলিশ জানায়, কোনও স্থায়ী কাজ করতেন না প্রভাস। যাখন যা পেতেন তা-ই করতেন। কখনও ভ্যান চালাতেন। তবে নেশা করতেন তিনি।
প্রভাসের মা সন্ধ্যা মণ্ডল বলেন, আমাদের কথা শুনত না। নেশা করত। জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় বাকি অভিযুক্তেরাও প্রভাসের নেশার সঙ্গী ছিলেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রভাস মণ্ডল স্থায়ী কোনো পেশায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন সময় ভ্যান চালানোসহ নানা ধরনের কাজ করতেন। তদন্তে জানা গেছে, তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং গ্রেফতারের পর প্রথমদিকে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে অন্যান্য অভিযুক্তদের সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুত চার্জশিট দাখিল এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।
মন্তব্য করুন
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম