
হালাল জীবিকা অর্জনের জন্য পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। তবে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের চেষ্টা রিজিকের একটি মাধ্যম হলেও প্রকৃত রিজিকদাতা একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা। তাই একজন মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত—রিজিক কেবল শ্রমের ফল নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত দান। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা করেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব তাঁর ওপর নেই। (সুরা হুদ: ৬)
অন্য আয়াতে তিনি ঘোষণা করেন, "আসমানেই রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে।" (সুরা আয-যারিয়াত: ২২)
জীবনের অভাব-অনটন থেকে মুক্তি এবং রিজিকে বরকত লাভের জন্য কুরআন ও হাদিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে সেসব আমল তুলে ধরা হলো—
১. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা রিজিকে বরকত লাভের অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। (সুরা আত-তালাক: ২-৩)
গুনাহ বর্জন, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন এবং আল্লাহভীতির জীবন রিজিকে বরকত আনে।
২. নিয়মিত ইস্তিগফার করা ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত ও বরকতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি বৃষ্টি, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং নানাবিধ নিয়ামত দান করেন। (সুরা নুহ: ১০-১২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিক দান করবেন। (আবু দাউদ: ১৫১৮)
৩. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া সালাত শুধু ইবাদত নয়, বরং জীবনে বরকত ও প্রশান্তির উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন, পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে রিজিক চাই না; আমিই তোমাকে রিজিক দিই। (সুরা ত্ব-হা: ১৩২)
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিকে প্রশস্ততা আসে এবং জীবনে বরকত বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং জীবনে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৫৭)
এ সম্পর্ক রক্ষা শুধু অর্থনৈতিক নয়, পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক কল্যাণও বয়ে আনে।
৫. দান-সদকা করা শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে দান থেকে বিরত রাখতে চায়। কিন্তু আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদের তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। (সুরা আল-বাকারা: ২৬৮)
আল্লাহ আরও বলেন, তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে আরও দান করেন। তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা (সুরা সাবা: ৩৯)। রাসুল (সা.) বলেছেন ,দান করার কারণে কোনো সম্পদ কমে না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)
আরেক হাদিসে এসেছে, প্রতিদিন দুইজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানকারীর সম্পদের বদলা দিন। অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ ধ্বংস করে দিন। (সহিহ বোখারি: ১৪৪২)
৬. হালাল উপার্জন করা হালাল উপার্জনে বরকত রয়েছে, আর হারাম উপার্জন ইবাদত কবুল হওয়ারও অন্তরায়। রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, সে দীর্ঘ সফরে, এলোমেলো চুলে, ধূলিধূসর অবস্থায় দুই হাত তুলে দোয়া করে, হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা প্রতিপালিত। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম : ১০১৫)
অতএব, রিজিকে বরকত চাইলে হালাল উপার্জনের বিকল্প নেই।
৭. আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা তাওয়াক্কুল অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের পাখিদের মতো রিজিক দিতেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। (তিরমিজি: ২৩৪৪)
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যে নয়; বরং হালাল উপার্জন, রিজিকে বরকত, অন্তরের প্রশান্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই নিহিত। তাই জীবনের সংকট ও অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পেতে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত আমলগুলো নিয়মিত পালন করা উচিত। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেন না, আর যারা তাঁর ওপর ভরসা করে, তারা কখনো নিরাশ হয় না।
মন্তব্য করুন