
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ, ঈমান নবায়নের এক অনন্য উপলক্ষ এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। প্রতি শুক্রবার মুসলমানরা দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে আল্লাহর ঘরে সমবেত হন, খুতবা শ্রবণ করেন এবং জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন।
কিন্তু ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? ইতিহাস ও ইসলামি সূত্রে রয়েছে এর বিস্তারিত বর্ণনা।
‘জুমা’ শব্দের অর্থ কী? আরবি ‘জুমুআহ’ (الجمعة) শব্দের অর্থ হলো একত্র হওয়া, সমবেত হওয়া বা সংঘবদ্ধ হওয়া। যেহেতু এ দিনে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে একত্রিত হন, তাই দিনটির নাম রাখা হয়েছে ইয়াওমুল জুমুআহ।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘জুমুআহ’, যদিও ইমাম আ‘মাশ (রহ.) ‘জুমআহ’ উচ্চারণও গ্রহণ করেছেন। বাংলা ভাষায় এটি সাধারণভাবে ‘জুমা’ নামে পরিচিত। (তাফসিরে রুহুল মাআনি: ১৪/৯৯, দরসে তিরমিজি: ২/১৯২)
ইসলামপূর্ব যুগে শুক্রবারের নাম ইসলামের আগমনের আগে আরবরা শুক্রবারকে ‘ইয়াওমুল আরুবা’ নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের মতে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এ দিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ রাখেন।
তিনি প্রতি শুক্রবার কুরাইশদের সমবেত করে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করতেন। এই ঘটনা মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রায় ৫৬০ বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। এরপর থেকেই শুক্রবার সমাবেশ ও ঐক্যের দিন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ১৩৭১)
কোরআনের আলোকে জুমার গুরুত্ব ইসলামে জুমার মর্যাদা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নাম রাখা হয়েছে সুরা জুমুআহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। (সুরা জুমুআহ, আয়াত: ৯)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জুমা কেবল একটি সাপ্তাহিক নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জুমা শুধু একটি নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি মহান ইবাদত।
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে কুবা এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছলে জোহরের সময় হয়ে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন।
ইতিহাসে এটিই মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিসেবে স্বীকৃত। আর এই ঘটনাই ইসলামী ইতিহাসে জুমার নামাজের বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর থেকে মুসলমানদের জন্য জুমার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়। (দরসে তিরমিজি : ২/১৯২, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৪৪)
মদিনায় জুমার প্রাথমিক চর্চা মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই সেখানে বসবাসকারী আনসার সাহাবিরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করেন, আনসারগণ আলোচনা করলেন—ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত রয়েছে, যেদিন তারা সমবেত হয়। অতএব মুসলমানদেরও একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন সবাই একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে।
জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক মহাসমাবেশ। আনসার সাহাবিদের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমার মাধ্যমে এ ইবাদতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
আজও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান প্রতি শুক্রবার মসজিদে সমবেত হয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন, খুতবা শ্রবণ করেন এবং জামাতে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে ইসলামের ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও তাকওয়ার শিক্ষা ধারণ করেন।
জুমা আমাদের শেখায় আল্লাহর স্মরণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শৃঙ্খলা এবং ইসলামের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর আদব ও সুন্নত যথাযথভাবে পালন করা এবং এ বরকতময় দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
মন্তব্য করুন