
বোস্টনের কনকনে হাওয়া আর গ্যালারির উত্তাল গর্জনের মাঝে ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াইয়ে আজ মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স ও মরক্কো। হাই-ভোল্টেজ এই সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে একের পর এক নাটকীয়তা আর রোমাঞ্চের সাক্ষী হলো বোস্টনবাসী। প্রথমার্ধের রুদ্ধশ্বাস পেনাল্টি মিসের মানসিক ধাক্কা সামলে দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বর্তমান ফুটবলের পরাশক্তি ফ্রান্স। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উইঙ্গার উসমান দেম্বেলের ব্যাক-টু-ব্যাক বিধ্বংসী জোড়া আক্রমণে এই মুহূর্তে মরক্কোকে ২–০ ব্যবধানে পিছিয়ে দিয়ে সেমিফাইনালের রাজপথে পা বাড়িয়েছে দিদিয়ে দেশমের দল।
বোস্টনের মাঠে নাটকের পর নাটক: এমবাপ্পের গোল ও বুনোর পেনাল্টি সেভ
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ট্যাকটিক্যাল লড়াই ছিল দেখার মতো। মরক্কো শিবিরে ম্যাচের আগেই বড় ধাক্কা হয়ে আসে তারকা খেলোয়াড় ইসমাইল সাইবারির ইনজুরি। সাইবারি খেলতে না পারায় মরক্কোর সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে বিলাল এল খানুসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ব্রাহিম দিয়াজকে রাখা হয় ডান উইংয়ে।
খেলার শুরুর দিকেই কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি রকেট গতির শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর ম্যাচের মাঝপথে ডি-বক্সের ভেতর ফাউল থেকে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। কিন্তু মরক্কোর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা জাদুকরী গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু অবিশ্বাস্য দক্ষতায় এমবাপ্পের নেওয়া পেনাল্টি শটটি রুখে দিয়ে ফ্রান্সকে স্তব্ধ করে দেন।
তবে একজন বিশ্বসেরা মহাতারকার আসল পরিচয় যে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো, তা প্রমাণ করলেন এমবাপ্পে। পেনাল্টি মিসের ক্ষোভকে আগুনে ফিনিশিংয়ে রূপ দিয়ে মরক্কোর রক্ষণ চিরে এক চোখধাঁধানো ফিল্ড গোল করে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন ফরাসি অধিনায়ক। এবার আর ঝাঁপিয়ে পড়েও বলের নাগাল পাননি বুনু।
দেম্বেলের দ্বিতীয় আঘাত: মরক্কোর প্রতিরোধ চূর্ণ
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো যখন ম্যাচে সমতায় ফিরতে তাদের রক্ষণভাগ কিছুটা ওপরে তুলে আক্রমণ গোছানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই সুযোগটাই নেয় ফরাসি গতিদানবরা।
ফ্রান্সের মাঝমাঠ থেকে এক নিখুঁত পাসে বল পান ডান প্রান্তে থাকা উসমান দেম্বেলে। মরক্কোর লেফট-ব্যাক পজিশন ফিরে পাওয়ার আগেই নিজের ট্রেডমার্ক ড্রিবলিংয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপর কোণাকুণি পজিশন থেকে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে কোনো সুযোগ না দিয়ে এক বুলেট গতির নিচু শটে বল জালে জড়ান দেম্বেলে। ২-০ স্কোরলাইন হতেই বোস্টনের গ্যালারিতে ফরাসি সমর্থকদের উল্লাস আর মরক্কান শিবিরের স্তব্ধতা নেমে আসে।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার বিশ্লেষণ ফরাসি আক্রমণভাগের বিধ্বংসী রূপ ও মানসিকতা: কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসের মতো বড় মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ফিল্ড গোল করা এবং এরপর উসমান দেম্বেলের কাউন্টার অ্যাটাকিং গতি ও ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে আজ বিশ্বসেরা প্রমাণ করেছে। দুই উইং থেকেই মরক্কোর ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে তারা। মরক্কোর ট্যাকটিক্যাল ভুল ও ক্লান্তি: সাইবারির ইনজুরির ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধে বুনুর পেনাল্টি সেভে মরক্কো বীরত্ব দেখালেও, ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর তারা ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে। সমতায় ফেরার তাড়ায় ডিফেন্সের ফাঁকফোকর তৈরি করে ফেলা এবং দেম্বেলেকে কাউন্টারে একা ছেড়ে দেওয়াটাই তাদের জন্য কাল হয়েছে।
বুনুর অসহায় আত্মসমর্পণ: পেনাল্টি রুখে দিয়ে যিনি প্রথমার্ধের নায়ক ছিলেন, ফ্রান্সের এই ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বমানের ফিনিশিংয়ের সামনে সেই ইয়াসিন বুনুও এবার পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছেন।
ম্যাচ এখন যে মোড়ে বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া মরক্কোর জন্য এখন সেমিফাইনালের স্বপ্ন অলীক কল্পনার মতো। ম্যাচ বাঁচাতে হলে ব্রাহিম দিয়াজ ও বিলাল এল খানুসদের অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হবে। অন্যদিকে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পকেটে পোরা ফ্রান্স এখন চাইবে বল পজিশন ধরে রেখে সময় পার করতে এবং সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে।
মন্তব্য করুন