
সুন্দরবনের কুখ্যাত বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা হলেন আলামিন হোসেন (৪০), তৈবুর রহমান (২৪) ও মনিরুজ্জামান মামুন (২০)। আত্মসমর্পণের পর তাদের প্রত্যেকের মুখেই উঠে এসেছে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথা।
বৃহস্পতিবার সকালে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মোংলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনজনকে উপস্থিত করা হয়। এর একদিন আগে বুধবার বিকেলে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার তাম্বুলবুনিয়া ফরেস্ট অফিসসংলগ্ন এলাকায় তারা কোস্ট গার্ডের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
সংবাদ ব্রিফিংয়ের ফাঁকে আত্মসমর্পণকারী মনিরুজ্জামান মামুন বলেন, গত তিন বছর ধরে তিনি বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, বনের বাঘের আতঙ্ক এবং প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার বা মৃত্যুভয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই কোস্ট গার্ডের নম্বরে ফোন করে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।
তৈবুর রহমান জানান, ২০১৮ সালেও তিনি র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে পুরনো মামলার জটিলতা, নিয়মিত আদালতে হাজিরা এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় তিনি আবারও দস্যু দলে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এবার সরকারের কাছে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
আলামিন হোসেনের ভাষ্য, মাত্র চার মাস আগে দস্যুরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকে দলে টেনে নেয়। এরপর নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দস্যু কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে বাধ্য হন। আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সেই জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আত্মসমর্পণকারী তিন দস্যুর কাছ থেকে দুটি দেশীয় একনলা বন্দুক, একটি পাইপগান, ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং একটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের জিম্মিদশায় থাকা এক জেলেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে "অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন" এবং "অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড" পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানের আওতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এখন পর্যন্ত ৪৯টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪২ জন বনদস্যুকে আটক এবং তাদের হাতে জিম্মি থাকা ৪১ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে কুখ্যাত ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্যও অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
সুন্দরবন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বন রক্ষা আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, বর্তমানে বনদস্যুরা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপেই নয়, প্রকৃতি ও টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতার কাছেও পরাজিত হচ্ছে। তবে আত্মসমর্পণের পাশাপাশি তাদের কার্যকর পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
মন্তব্য করুন