
বোস্টনের কনকনে হাওয়া আর গ্যালারির উত্তাল গর্জনের মাঝে অবশেষে অবসান হলো ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক লড়াইয়ের। আফ্রিকান জায়ান্ট মরক্কোর ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ ও অবিশ্বাস্য রূপকথাকে ২-০ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে বর্তমান ফুটবলের পরাশক্তি ফ্রান্স। বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে পেনাল্টি মিসের নাটকীয়তা, ইনজুরি ধাক্কা আর উইং প্লে’র দুর্দান্ত প্রদর্শনী শেষে শেষ হাসি হাসল দিদিয়ে দেশমের দল। এই জয়ের ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ার পথে ‘লে ব্লু’রা এখন মাত্র এক ধাপ দূরে।
বোস্টনের মহানাটকের ইতি: যেভাবে এলো ফরাসি জয়
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ট্যাকটিক্যাল লড়াই ছিল দেখার মতো। মরক্কো শিবিরে ম্যাচের আগেই বড় ধাক্কা হয়ে আসে তারকা খেলোয়াড় ইসমাইল সাইবারির ইনজুরি। সাইবারি খেলতে না পারায় মরক্কোর সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে তরুণ বিলাল এল খানুসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ব্রাহিম দিয়াজকে রাখা হয় ডান উইংয়ে।
খেলার শুরুর দিকেই কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি রকেট গতির শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর ম্যাচের প্রথমার্ধের মাঝপথে ডি-বক্সের ভেতর ফাউল থেকে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। কিন্তু মরক্কোর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা জাদুকরী গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু অবিশ্বাস্য দক্ষতায় এমবাপ্পের নেওয়া পেনাল্টি শটটি রুখে দিয়ে ফ্রান্সকে স্তব্ধ করে দেন। তবে একজন বিশ্বসেরা মহাতারকার আসল পরিচয় যে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো, তা ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধেই প্রমাণ করলেন এমবাপ্পে। পেনাল্টি মিসের ক্ষোভকে আগুনে ফিনিশিংয়ে রূপ দিয়ে মরক্কোর রক্ষণ চিরে এক চোখধাঁধানো ফিল্ড গোল করে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন ফরাসি অধিনায়ক। এবার আর ঝাঁপিয়ে পড়েও বলের নাগাল পাননি বুনু।
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো যখন সমতায় ফিরতে রক্ষণভাগ কিছুটা ওপরে তুলে আক্রমণ গোছানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই সুযোগটাই নেয় ফরাসি গতিদানবরা। ফ্রান্সের মাঝমাঠ থেকে এক নিখুঁত পাসে বল পান ডান প্রান্তে থাকা উসমান দেম্বেলে। মরক্কোর লেফট-ব্যাক পজিশন ফিরে পাওয়ার আগেই নিজের ট্রেডমার্ক ড্রিবলিংয়ে বক্সে ঢুকে কোণাকুণি পজিশন থেকে এক বুলেট গতির নিচু শটে বল জালে জড়ান দেম্বেলে (২-০)। ম্যাচের বাকি সময় এই লিড ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার বিশ্লেষণ
ফরাসি আক্রমণভাগের বিধ্বংসী রূপ ও মানসিকতা: কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসের মতো বড় মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ফিল্ড গোল করা এবং এরপর উসমান দেম্বেলের কাউন্টার অ্যাটাকিং গতি ও ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে আজ বিশ্বসেরা প্রমাণ করেছে। মাঝমাঠ ও উইংয়ের দারুণ সমন্বয়ে মরক্কোর ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে তারা।
মরক্কোর ট্যাকটিক্যাল ভুল ও ক্লান্তি: সাইবারির ইনজুরির ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধে বুনুর পেনাল্টি সেভে মরক্কো বীরত্ব দেখালেও, ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর তারা ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে। সমতায় ফেরার তাড়ায় ডিফেন্সের ফাঁকফোকর তৈরি করে ফেলা এবং দেম্বেলেকে কাউন্টারে একা ছেড়ে দেওয়াটাই তাদের জন্য কাল হয়েছে। ইয়াসিন বুনুর একক লড়াই: পেনাল্টি রুখে দিয়ে যিনি প্রথমার্ধে মরক্কোকে ম্যাচে রেখেছিলেন, ফ্রান্সের এই ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বমানের ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের সামনে সেই ইয়াসিন বুনুও শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছেন। তবে ম্যাচজুড়ে তার পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়।
সেমিফাইনালে ডেকোরেশন: সামনে স্পেন নাকি বেলজিয়াম?
বোস্টনে মরক্কোর রূপকথার সমাপ্তি ঘটিয়ে ফ্রান্স এখন সেমিফাইনালের রাজপথে। আগামী ১৪ জুলাই মঙ্গলবার ডালাসে সেমিফাইনালের মেগা ম্যাচে মাঠে নামবে ফরাসিরা। সেখানে তারা মুখোমুখি হবে স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যকার কোয়ার্টার-ফাইনাল ম্যাচের বিজয়ী দলের। বিশ্বমঞ্চে দিদিয়ে দেশমের শিষ্যদের এই আধিপত্য ফুটবল ভক্তদের আরও একটি রোমাঞ্চকর সেমিফাইনাল উপহার দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন