সোমবার
০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩

বিপদ মুহূর্তে আল্লাহ নবীদের রক্ষা করেছিলেন যেভাবে

ইসলামী জাহান ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
বিপদ মুহূর্তে আল্লাহ নবীদের রক্ষা করেছিলেন যেভাবে

মানবজাতির ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে বাহ্যিক শক্তি, সামরিক ক্ষমতা কিংবা সংখ্যার বিচারে সত্যের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী মনে হয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে সেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কোরআনে বর্ণিত নবীদের জীবনচরিত এমন অসংখ্য ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে, যা যুগে যুগে ঈমানদারদের জন্য আশা, ধৈর্য, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা) এবং সত্যের পথে অটল থাকার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

নিচে কোরআনে বর্ণিত এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরা হলো।

নুহ (আ.) ও মহাপ্লাবন: অবিশ্বাসীদের ধ্বংস, মুমিনদের মুক্তি প্রায় ৯৫০ বছর ধরে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান জানান নুহ (আ.)। দীর্ঘ এই সময়ে অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান আনলেও অধিকাংশই তাঁকে উপহাস করে এবং তাঁর অনুসারীদের অবজ্ঞা করে।

আল্লাহর নির্দেশে তিনি একটি নৌকা নির্মাণ করেন। এরপর আকাশ থেকে প্রবল বর্ষণ এবং জমিন থেকে পানির উৎস উন্মুক্ত হলে ভয়াবহ প্লাবনে অবিশ্বাসীরা ধ্বংস হয়। অন্যদিকে নুহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নৌকায় নিরাপদে রক্ষা পান।

আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আকাশের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দিলাম প্রবল বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এবং মাটি থেকে প্রবাহিত করলাম ঝর্ণাসমূহ। (সুরা আল-কামার: ১১-১২)

আরও বলেন, অতঃপর আমি তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের নৌকায় উদ্ধার করলাম এবং যারা আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা বলেছিল, তাদের ডুবিয়ে দিলাম। (সুরা আল-আরাফ: ৬৪)

ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য আগুন শীতল হয়ে যাওয়া তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার কারণে ইবরাহিম (আ.)-কে শাস্তি দিতে তাঁর জাতি বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে। মানবিক বিচারে সেখানে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর জন্য আগুনকেও অনুগত করে দেন। কোরআনে এসেছে- ‘আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া: ৬৯)

আগুন তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ সাহায্যের এক বিস্ময়কর নিদর্শন।

মুসা (আ.)-এর জন্য সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বনি ইসরাইলকে নিয়ে বের হওয়ার পর মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা একদিকে বিশাল সাগর এবং অন্যদিকে ফেরাউনের সুসজ্জিত বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ে যান। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার আর রক্ষা নেই। কিন্তু মুসা (আ.) দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন-

‘কখনো নয়, নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন; তিনি আমাকে অচিরেই পথ দেখাবেন।’ (সুরা শুআরা: ৬২)

এরপর আল্লাহর নির্দেশে লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করামাত্র সাগর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এবং মাঝখানে শুষ্ক পথ তৈরি হয়। বনি ইসরাইল নিরাপদে পার হয়ে যায়; ফেরাউন ও তার বাহিনী সাগরে ডুবে ধ্বংস হয়। (সুরা শুআরা: ৬৩-৬৬)

ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে আল্লাহর বিস্ময়কর সাহায্য ভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ইউসুফ (আ.)-কে কূপে নিক্ষেপ করা হয়। পরে তিনি দাস হিসেবে বিক্রি হন এবং মিথ্যা অভিযোগে কারাগারেও বন্দি থাকেন। বাহ্যিকভাবে তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল কষ্ট ও বঞ্চনায় পূর্ণ। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

দীর্ঘ পরীক্ষার পর আল্লাহ তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন এবং মিসরের অর্থভাণ্ডারের দায়িত্ব অর্পণ করেন। একসময়ের অসহায় কিশোরই পরিণত হন দেশের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘এভাবেই আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম।’ (সুরা ইউসুফ: ২১)

জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে ইউসুফ (আ.) নিজেই আল্লাহর এই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে বলেন- ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাজত্ব দান করেছেন এবং আমাকে কথার মর্ম ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা ইউসুফ: ১০১)

তাঁর জীবনের ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহ চাইলে কূপের অন্ধকার থেকে সম্মানের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে দিতে পারেন।

ইউনুস (আ.)-এর মুক্তি নিজ জাতির অব্যাহত অবাধ্যতায় কষ্ট পেয়ে ইউনুস (আ.) আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশের আগে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পরে সমুদ্রে একটি বড় মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। গভীর অন্ধকারে তিন স্তরের আঁধারে আবৃত সেই পরিস্থিতিতে তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে আসেন এবং বলেন-

‘আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)

আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং মাছটি তাঁকে তীরে উগরে দেয়। আল্লাহ বলেন- ‘এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৮)

আইয়ুব (আ.)-এর ধৈর্যের পুরস্কার আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ সময় কঠিন রোগ, সম্পদহানি ও পারিবারিক পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি। অবশেষে আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ বলেন-

‘আমি তাঁর প্রার্থনা কবুল করলাম এবং তাঁর কষ্ট দূর করে দিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৪)

এ ঘটনা প্রমাণ করে, দীর্ঘ পরীক্ষার পরও আল্লাহর সাহায্য আসতে পারে।

ঈসা (আ.)-কে আসমানে উত্তোলন বনি ইসরাইলের ষড়যন্ত্রকারীরা যখন ঈসা (আ.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে ঘেরাও করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে বিশেষ পন্থায় রক্ষা করেন। কোরআনে এসেছে-

‘বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা: ১৫৮)

এ ঘটনাও আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ও সুরক্ষার এক অনন্য নিদর্শন।

সওর গুহায় মহানবী (স.)-এর সুরক্ষা মক্কার কাফিররা যখন মহানবী (স.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে, তখন তিনি হজরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। পথে তাঁরা সওর গুহায় আশ্রয় নেন। শত্রুরা গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও আল্লাহ তাঁদের নিরাপদ রাখেন।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা যদি তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছেন, যখন কাফিররা তাকে বের করে দিয়েছিল। যখন তারা দুজন গুহায় ছিল, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন, ‘চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ অতঃপর আল্লাহ তাঁর ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং এমন বাহিনী দ্বারা তাঁকে সাহায্য করলেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি।’ (সুরা তাওবা: ৪০)

এ ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহর সাহায্য এলে সামান্য আশ্রয়স্থলও নিরাপত্তার দুর্গে পরিণত হতে পারে।

মুহাম্মদ (স.) ও বদরের বিজয় বদরের যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক অসম লড়াই। মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে বিশ্বনবী (স.) মক্কার প্রায় এক হাজার সুসজ্জিত বাহিনীর মুখোমুখি হন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমানদের জয় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছিলেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল।’ (সুরা আলে ইমরান: ১২৩)

আরও বলেন- ‘যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি তা কবুল করেছিলেন।’ (সুরা আনফাল: ৯)

সেদিন আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে মুসলমানদের সাহায্য করেছিলেন। এ বিজয় ছিল আল্লাহর সাহায্যের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।

ঈমানদারদের জন্য শিক্ষা নবীদের জীবনের এসব ঘটনা একটি মৌলিক সত্যের সাক্ষ্য বহন করে—আল্লাহর সাহায্য কখনো শুধু বাহ্যিক শক্তি, সংখ্যা কিংবা সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। যখন একজন বান্দা আন্তরিকভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, ধৈর্য ধারণ করে এবং সত্যের পথে অবিচল থাকে, তখন আল্লাহ এমন পথ খুলে দেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।

আল্লাহ তাআলা বলেন— আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। (সুরা আত-তালাক: ২-৩)

নবীদের জীবনের এই ঘটনাগুলো আজও মুমিনদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে, সংকট যত কঠিনই হোক না কেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সত্যের পথে অবিচল থাকলে তাঁর সাহায্য এমন সময় আসে, যখন মানুষের সব হিসাব-নিকাশ ব্যর্থ হয়ে যায়।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বেগম রোকেয়া পদকের জন্য মনোনয়ন আহ্বান

বিপদ মুহূর্তে আল্লাহ নবীদের রক্ষা করেছিলেন যেভাবে

ফোল্ডিং আইফোন আনছে অ্যাপল

৬ জুলাই: ইতিহাসের এই দিনে কী ঘটেছিল

বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি

নেইমারের গোলো হলো না রক্ষা, ব্রাজিলকে বিদায় করল নরওয়ে

হালান্ডের বুলেট গোল, নরওয়ের কাছে হেরে বিদায়ের মুখে ব্রাজিল

গৌরীকে বিয়ে করলেন আমির খান

ইরান যুদ্ধ: আমিরাতে আয়রন ডোম ও সেনা পাঠিয়েছিল ইসরায়েল

টেকনো স্মার্টফোনের দাম কমলো

নিল্যান্ডের জাদুকরী সেভ, ১৪ মিনিটে পেনাল্টি মিসের হতাশায় পুড়ল ব্রাজিল

শুরুতেই কাঁপল ব্রাজিল, অফসাইডের স্বস্তিতে রক্ষা সেলেসাওদের

কাতারের জলসীমায় স্বাভাবিক, নৌচলাচল শুরু

খরায় পুড়ছে ইউরোপ, পানি সংকটে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত

এরদোয়ান / যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা যেন ইসরায়েল নস্যাৎ করতে না পারে

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে তেল টার্মিনালে ইউক্রেনের হামলা

কারাভোগ শেষে ভারত থেকে দেশে ফিরলেন ৫০ বাংলাদেশি

হৃদরোগ দূরে রাখতে যা করতে হবে

জামায়াত কি আসলেই শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চায়?

বিশ্বকাপ খেলা দেখা নিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ৯

X