
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলেও জামায়াত শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না। তার ভাষ্য ছিল, বাংলাদেশ বিদ্যমান আইনেই চলবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত থাকবে।
তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি রেজিমেন্টেড রাজনৈতিক দল। তাদের নির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্য রয়েছে। তবে শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য তারা ধারণ করে, তা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া বা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যায় না।”
মির্জা ফখরুলের এ বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—জামায়াত কি সত্যিই শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, নাকি এটি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ?
জামায়াতের শীর্ষ নেতারা অবশ্য বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যকে তার ব্যক্তিগত নয়, দলীয় অবস্থান হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, জামায়াত দল পরিচালনায় নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুসরণ করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের সংবিধান, বিদ্যমান আইন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই অনুসরণ করবে। জনমতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
‘এটা মির্জা ফখরুলের নিজস্ব বক্তব্য নয়’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেবের সাম্প্রতিক বক্তব্য তার নিজের নয়, তিনি দলের মুখপাত্র হিসেবে এসব বলছেন।”
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। তার আদর্শিক অবস্থান থেকে কখনও জামায়াতকে এভাবে আক্রমণ করতে দেখিনি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা আমার মনে হয় তিনি নিজেও অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন না।”
‘গণতন্ত্র না মানার সংজ্ঞা কোথায় পেলেন?’
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “তিনি বলেছেন জামায়াত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, কারণ সংবিধান সংস্কার কমিশনে প্রতিনিধি দেয়নি। কিন্তু প্রতিনিধি না দিলেই কীভাবে একটি দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না? গণতন্ত্র তো অনেক বিস্তৃত বিষয়। এটিকে এত সংকীর্ণভাবে দেখার ভিত্তি কী?”
তার দাবি, বিএনপিও অতীতে জনগণের দেওয়া রায় সবসময় মেনে চলেনি।
“তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে গণভোট হয়েছিল। সেই গণভোটের ফল কি তারা মেনেছে? যারা জনগণের রায়ই মানে না, তারা আবার কোন গণতন্ত্রের কথা বলে?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
‘শরিয়াহ মানেই শুধু হাত কাটা নয়’
শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘মির্জা ফখরুল শরিয়াহ আইন বলতে শুধু হাত কাটা বা শিরচ্ছেদের মতো বিষয় বোঝান। অথচ শরিয়াহর মধ্যে বহু জনকল্যাণমূলক বিষয়ও রয়েছে, সেগুলো নিয়ে তারা কথা বলেন না।’
ক্ষমতায় গেলে কী করবে জামায়াত?
জামায়াত ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে—এ প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি ও জনমতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। গণতন্ত্রকে সামনে রেখেই আমরা দেশ চালাতে চাই। মানবসমাজের জন্য যে আইন কল্যাণকর, তা প্রচলিত আইন থেকেই হোক বা শরিয়াহর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হোক—প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জনগণের উপযোগী আইনই বাস্তবায়ন করা হবে।”
‘বিভাজনের রাজনীতি নয়’
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “জনগণকে বিভ্রান্ত করা, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করা বা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে আবারও জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা বড় রাজনৈতিক দলের কাজ হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীও সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একদিকে ঐক্যের কথা বলা, অন্যদিকে বিভাজন তৈরির মতো বক্তব্য দেওয়া—এ দুটি একসঙ্গে যায় না। আমরা এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাই এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি।”
মন্তব্য করুন