
প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী সুপার টাইফুন বাভি দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হওয়ায় পুরো অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এপ্রিল মাসের পর এটিই চলতি বছরের দ্বিতীয় সুপার টাইফুন, যার শক্তি ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমতুল্য বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পাশাপাশি অন্তত সাত দিনের জরুরি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত করার নির্দেশ দিয়েছে।
জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় টাইফুন বাভির স্থায়ী বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৬৯ কিলোমিটার (১৬৭ মাইল) এবং দমকা বাতাসের গতি পৌঁছায় ৩২৪ কিলোমিটার (২০১ মাইল) পর্যন্ত।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সোমবার টাইফুনটির কেন্দ্র রোটা দ্বীপের খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। সে সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৭৮ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গুয়ামের এক সৈকতে দাঁড়িয়ে ৪৮ বছর বয়সী আরাবেলা পলিনো এএফপিকে বলেন, “আমার মেয়েরা বলছিল, এটা ভয়ংকর লাগছে। কিন্তু সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার বাড়ি কংক্রিটের, তাই সবচেয়ে খারাপ হলে শুধু একটি জানালা ভেঙে যেতে পারে।”
তার বন্ধু ৫১ বছর বয়সী ডার্মা সোলাদাওব বলেন, “এপ্রিলের টাইফুন সিনলাকু ২০২৩ সালের মাওয়ারের মতো ভয়াবহ ছিল না। মাওয়ারে আমার পুরো বাড়িই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।” বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
তিনি আরও বলেন, “আমার বাড়ি কংক্রিটের হলেও বাতাসের শব্দ ও ঝড় ভয়ংকর লাগে। তাই এবার আমি হোটেলে যাচ্ছি।”
ঝড়ের কারণে গুয়ামে শনিবার রাত ১০টা থেকে ‘কন্ডিশন অব রেডিনেস–২’ জারি করা হয়েছে, যার অর্থ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাইফুন আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, রবিবার সকাল ৭টা থেকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হবে। নাগরিকদের প্রতিটি পরিবারের জন্য অন্তত সাত দিনের খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিছানাপত্র ও স্বাস্থ্যসামগ্রী সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে পোষা প্রাণী নেওয়া যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং সাইপানের লিবারেশন ডে উপলক্ষে পরিকল্পিত অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রায় দুই লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপগুলোতে মানুষ ইতোমধ্যে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছে এবং হার্ডওয়্যার দোকান থেকে জানালা ঢাকার জন্য প্লাইউড কিনে মজুত করছে। পাশাপাশি খাদ্য, পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নর্দার্ন মারিয়ানার কাগম্যান গ্রামের বাসিন্দা জেফ গার্সিয়া (৪৮) বলেন, “আমরা আগেও সুপার টাইফুন মোকাবিলা করেছি। পানি, মোমবাতি, ব্যাটারি ও টিনজাত খাবার মজুত করেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঐক্য, প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলা।”
নর্দার্ন মারিয়ানায় প্রায় ৪০ হাজার এবং গুয়ামে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ বসবাস করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এই অঞ্চল বড় বড় যুদ্ধের সাক্ষী ছিল।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সুপার টাইফুন সিনলাকু ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। এতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ, উপড়ে যায় গাছপালা, উল্টে যায় গাড়ি এবং অনেক ভবনের ছাদ উড়ে যায়।
ঝড়ের সময় একটি পণ্যবাহী জাহাজ এমভি মারিয়ানা ইঞ্জিন বিকল হয়ে উল্টে যায়। এতে একজন ক্রু সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আরও পাঁচজন নিখোঁজ হন, যাদের মৃত বলে ধারণা করা হয়।
আমেরিকান রেড ক্রস জানিয়েছে, অনেক মানুষ এখনো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বা অস্থায়ী ছাদের নিচে বসবাস করছে। তারা ঝড়ের আগে জরুরি সহায়তা দল মোতায়েন করেছে।
সাইপানের আস লিতো গ্রামের বাসিন্দা এম মারিলা (৪২) বলেন, “আবারও বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে—এটা খুবই কষ্টকর।”
স্যান আন্তোনিও গ্রামের হিসাবরক্ষক লেরি গালভান (৫০) বলেন, “আমি ক্লান্ত—প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং ছাদ মেরামত করতে করতে। আমাদের আরও মানসিক সহায়তা দরকার।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কপারনিকাস মেরিন সার্ভিস জানিয়েছে, চলতি জুন মাসে বিশ্বের মহাসাগরগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ সমুদ্র ঘূর্ণিঝড়কে আরও শক্তিশালী করে এবং ভারী বৃষ্টিপাত বাড়ায়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিইএমও) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে, যা বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
মন্তব্য করুন