
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির শুক্রবার কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকার দলটির ব্যবহৃত প্রধান কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার দাবি করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী নেতারা কয়েকজন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান এবং দলের কোষাধ্যক্ষ আকরুজ্জামান।
কার্যালয়ে প্রবেশের পর বিদ্রোহী শিবির প্রধান ফটকের তালা পরিবর্তন করে, নতুন পোস্টার টাঙায় এবং ভবনের ভেতরে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে তারা ঘোষণা দেয়, ভবিষ্যতে এই ভবন থেকেই তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং এটিই তাদের আনুষ্ঠানিক সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
দলের কোষাধ্যক্ষ আকরুজ্জামান দাবি করেন, এই কার্যালয়ের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। ভবনের মালিকপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
বিদ্রোহী শিবির ভবনের সামনে নতুন পোস্টার টাঙিয়ে জ্যেষ্ঠ বিধায়ক অরূপ রায়কে সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করে। তবে ভবনের ভেতরে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ও কাটআউট সরানো হয়নি।
ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেন, শনিবার থেকে তাদের শিবির আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যালয় থেকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তার ভাষ্য, আমরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং এটাই আমাদের সদর দপ্তর।
২০২২ সাল থেকে ভবনটি তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূল কার্যালয়ের সংস্কারকাজ চলাকালে দলটি সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
ঋতব্রত ব্যানার্জী ও তার সহযোগীরা ভারতের নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকের একদিন পরই কার্যালয় দখলের এই ঘটনা ঘটে। ওই বৈঠকে তারা দলের নাম, প্রতীক, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সম্পদের ওপর নিজেদের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষকে আগামী ৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে দলের সাংগঠনিক নির্বাচন, অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী এবং দলের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত নথি ও পাল্টা দাবি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে কার্যালয় দখলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত তৃণমূল বিধায়কেরা সেখানে পৌঁছালে তারা ফটকে তালাবদ্ধ অবস্থার মুখে পড়েন এবং ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
তৃণমূলের জ্যেষ্ঠ নেতা কুণাল ঘোষ এই ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দলের যেকোনো বিধায়কের দলীয় কার্যালয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাহলে সেখানে তালা লাগানোর প্রয়োজন কেন?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূলের কর্মীরা কোথাও আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে এরা অন্যের হাতের পুতুল হয়ে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবির অভিযোগ করেছে, বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপে রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশের নীরব সমর্থন রয়েছে। তবে বিদ্রোহী শিবির এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
গত মাসে বিদ্রোহীরা এক বিশেষ অধিবেশনে অরূপ রায়কে দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা পদে ঋতব্রত ব্যানার্জীর দাবির পক্ষে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন সমর্থন জানিয়েছিলেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বর্তমানে তাদের সঙ্গে প্রায় ৬৫ জন বিধায়ক রয়েছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ২০ জন ইতোমধ্যে দলত্যাগ করে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-এ যোগ দিয়েছেন এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি দলের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন।
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম, নির্বাচনী প্রতীক, সাংগঠনিক কাঠামো এবং আর্থিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের আসন্ন সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দলটির আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বৈধতা এবং নির্বাচনী প্রতীকের অধিকার শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষের হাতে থাকবে।
মন্তব্য করুন