
দেশে মোবাইল ফোন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনকে ঘিরে বাড়তে থাকা প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, মানিলন্ডারিং ও সাইবার অপরাধ দমনে একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো—একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০টির পরিবর্তে মাত্র ৫টি মোবাইল সিম নিবন্ধনের সুযোগ রাখা।
এছাড়া সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর যাচাই-বাছাই, পুরোনো সিম পুনঃযাচাই (রি-ভ্যারিফিকেশন), প্রি-অ্যাক্টিভেটেড সিম বিক্রি বন্ধ এবং মৃত ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিম মৃত্যুর ছয় মাস পর স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
মোবাইল ফোনের আইএমইআই, সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)-এর অপব্যবহার রোধে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, পুলিশ, এনটিএমসি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে অধিকাংশ সংস্থা একটি এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০টি সিমের পরিবর্তে ৫টি সিম নিবন্ধনের পক্ষে মত দেয়। তাদের মতে, অতিরিক্ত সিম ব্যবহার করে অপরাধীরা সহজেই পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত করছে।
সভাসূত্রে জানা গেছে, সভায় উপস্থিত সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা আরও বেশ কিছু মতামত তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-এক্টিভেটেড সিম বন্ধে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ; একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ১০টির বেশি সিম নিবন্ধন করা থাকলে তা বন্ধ করা; সিম রেজিস্ট্রেশনের জন্য লাইভ ভেরিফিকেশন বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেন্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা; করপোরেট সিম নিবন্ধন ও অপব্যবহার প্রতিরোধে যথাযথ ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করা; মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর ৬ মাস পর তার নামে নিবন্ধিত সিমটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা; যত্রতত্র অবাধে সিম বিক্রি বন্ধ করে শুধুমাত্র নিবন্ধিত কাস্টমার কেয়ারের মাধ্যমে সিম বিক্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটি সিম নিবন্ধনের সাত দিন পর অন্য সিম নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা, সিম এবং আইএমইআই নিবন্ধনের অপব্যবহার রোধে একটি অভিন্ন রিপোর্টিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা; যেসব সিম দীর্ঘ বছর আগে নিবন্ধিত হয়েছে এবং হাতবদল হয়ে গেছে সেসব সিম নতুন করে ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা করা; এজেন্ট এমএফএসের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সিমের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ নিশ্চিত করা; মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সব ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে ওটিপি ব্যবহার নিশ্চিত করা; নিয়মিত বিরতিতে গ্রাহক পরিচয় যাচাই করা; সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে রিয়েল টাইম ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেম চালু করা এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট পর্যায়ে গ্রাহক পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রশিক্ষণ ও অডিটিং বাধ্যতামূলক করা। এসব বিষয়ে সুপারিশ এসেছে টেকনিক্যাল কমিটির প্রতিবেদনেও।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারণা ও অবৈধ লেনদেনের মতো ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।
প্রতারক চক্র নিজেদের সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিনিধি (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) হিসেবে পরিচয় দিয়ে গ্রাহকের গোপন পিন নম্বর ও ওটিপি কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছে।
গ্রাহককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে, লটারি জেতার মিথ্যা খবর দিয়ে বা জরুরি বিপদের কথা বলে টাকা পাঠাতে বাধ্য করছে। গ্রাহকের মোবাইল সিম ক্লোন বা হ্যাক করে এমএফএস অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বেআইনিভাবে অর্থ পাচার, জুয়া খেলা এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন করা হচ্ছে।
এসব অপরাধ এবং অপরাধীচক্রের লাগাম টানতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল ফোনের আইএমইআই, সিম রেজিস্ট্রেশন দুর্বলতা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)-এর অপব্যবহারের কারণ উদ্ঘাটন এবং করণীয় নির্ধারণে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, ওই কমিটি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে ২৮টি সুপারিশ করা হয়। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতেই বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সেখানে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের নানা দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়।
সভায় উপস্থিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেন, মোবাইল ফোনের সিমের অপব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ হচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকেন্দ্রিক প্রতারণা ও অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এর বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন এই সার্ভিস পরিচালনায় অদক্ষ মানুষজন। গ্রামগঞ্জের হতদরিদ্র মানুষ প্রতারকদের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত অর্থ হারিয়ে বিপাকে পড়ছেন।
প্রতিমাসে মানিলন্ডারিং ও অনলাইন জুয়ার শত শত কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এই টাকার বড় অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। এমন প্রেক্ষাপটে সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন সভায় উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি সিম নিবন্ধনের পরিবর্তে পাঁচটিতে নামিয়ে আনার উদ্যোগ কবে নাগাদ কার্যকর হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, এখনই এটার ডেটলাইন বলা যাচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডেটলাইন নির্ধারণ করা হবে। এ নিয়ে কার্যক্রম চলমান। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জুয়ার হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। মানিল্ডারিং হচ্ছে। আমরা এগুলো বন্ধ করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের লেনদেন ইতোমধ্যে স্থগিত বা ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
এদিকে সরকার সম্প্রতি 'জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬' গেজেট প্রকাশ করেছে। নতুন আইনে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে জুয়ার অর্থ লেনদেনকে সরাসরি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন