
দেশের প্রধান বাণিজ্য করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
এ লক্ষ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু করে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সওজ সূত্র জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৫৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে এবং বাকি ১৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে জোগানের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান চার লেনের মহাসড়ককে উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা হবে। ধীরগতির ও স্থানীয় যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন থাকবে। নির্ধারিত প্রবেশ ও বহির্গমন পথ ব্যবহার করেই মূল এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংযোগস্থলগুলোকে গ্রেড-সেপারেটেড অবকাঠামোয় উন্নীত করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস এবং সার্ভিস বা সিস্টেম ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের পাশাপাশি শহরাঞ্চলের যানজট নিরসনে দীর্ঘ অংশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, শিমরাইল ও মদনপুর এবং চট্টগ্রামের বারইয়ারহাট, আবুতোরাব বাজার ও সলিমপুর এলাকায় মোট ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বলেন, প্রকল্পের আওতায় ৬৫ থেকে ৭৫ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এলিভেটেড ইন্টারচেঞ্জসহ আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ব্যয় তুলনামূলক বেশি হবে। প্রকল্প শেষ হলে কোথাও মহাসড়কটি আট লেন, কোথাও ১০ লেন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং কোনো অংশই ছয় লেনের কম থাকবে না।
নতুন এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হবে। এ জন্য পুরো করিডোরে চারটি প্রধান ও ১০০টি স্যাটেলাইট টোল প্লাজাসহ মোট ১০৪টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) এবং অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক আধুনিক টোল সংগ্রহ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
সওজের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কমে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। মহাসড়ককে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পাঞ্চল, গুদাম ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠারও সম্ভাবনা রয়েছে।
সওজের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য এই মহাসড়ক ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার যানবাহন এ সড়ক দিয়ে চলাচল করে, যার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পণ্যবাহী ট্রাক। ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের একসঙ্গে চলাচল, অসংখ্য সংযোগ সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক যানজটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ মহাসড়কে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নীতিগত অনুমোদনের আগে প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, দেশে সড়ক নির্মাণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ অনেক সময় দুর্বল থাকে। পিপিপি মডেলে ২৫ থেকে ৩০ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকায় সড়কের মান বজায় রাখা সহজ হয় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
সওজের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, মূল সড়ক নির্মাণে ২৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ৩৫ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণে ৩ হাজার ৫৯০ কোটি, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে ১ হাজার ৪৭৯ কোটি, সাইট ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে ১ হাজার ৩১৬ কোটি এবং আধুনিক ট্রাফিক ও টোল ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক পরিবহন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আলী রেজা সিদ্দিকী বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সড়ক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন