
দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা দুঃখ-কষ্ট—সবই সাময়িক। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হবে আখিরাতের পরিণতির মাধ্যমে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের বাস্তবতার এক গভীর চিত্র তুলে ধরেছেন।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— কিয়ামতের দিন এমন একজন ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, যিনি দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটিয়েছিলেন, কিন্তু তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। তাকে একবার জাহান্নামে প্রবেশ করানোর পর আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনো কোনো সুখ বা কল্যাণ দেখেছ?" তখন সে বলবে, "হে আমার রব! আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো সুখ দেখিনি।
অন্যদিকে এমন একজন মুমিনকে আনা হবে, যিনি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট, দুঃখ ও বিপদে ছিলেন। তাকে জান্নাতে একবার প্রবেশ করানোর পর জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো কোনো দুঃখ বা কষ্ট পেয়েছিলে?" তখন তিনি বলবেন, "আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো দুঃখ বা কষ্ট দেখিনি।
সূত্র: সহিহ মুসলিম (হাদিস: ৭০৮৮), মুসনাদে আহমাদ (হাদিস: ১৩১১২)
হাদিস থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায় ১. দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী। মানুষ দুনিয়াতে যত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই ভোগ করুক, যদি তার শেষ পরিণতি জাহান্নাম হয়, তবে জাহান্নামের সামান্য শাস্তিও তার সমস্ত সুখকে ভুলিয়ে দেবে।
অন্যদিকে, একজন মুমিন দুনিয়াতে যত কষ্টই ভোগ করুক, যদি তার গন্তব্য জান্নাত হয়, তবে জান্নাতের সামান্য নেয়ামতই তার সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে।
২. আখিরাতই প্রকৃত জীবন। তাই আসল সফলতা বা ব্যর্থতা দুনিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আখিরাতের পরিণতির ওপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন। ’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)
৩. আজ যারা দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, অপমান, নির্যাতন বা নানা বিপদে আক্রান্ত, তাদের জন্য এই হাদিস বিশাল সান্ত্বনার উৎস। কেননা একজন মুমিন যদি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, তবে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তার জীবনের সব কষ্টকে তুচ্ছ করে দেবে।
৪. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ দুনিয়াতে অত্যন্ত সুখী, ধনী ও ক্ষমতাবান। কিন্তু বাহ্যিক সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
যদি কেউ ঈমান ও নেক আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তার দুনিয়ার সমস্ত ভোগ-বিলাস আখিরাতে কোনো উপকারে আসবে না।
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী মানুষের চূড়ান্ত আবাস নয়; বরং এটি আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। তাই দুনিয়ার সুখে অহংকার করা যেমন উচিত নয়, তেমনি দুঃখ-কষ্টে হতাশ হওয়াও একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
একজন সচেতন মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ঈমান ও সৎকর্মে অটল থাকা এবং জান্নাত লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন