
বস্টন স্টেডিয়ামে তখন শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা। সাডেন ডেথের চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঁ পায়ের জোরাল শটে জার্মানির জাল কাঁপিয়েই ভোঁ-দৌড় দিলেন হোসে কানালে। মাঝমাঠ থেকে ছুটে এলেন সতীর্থরা, একের পর এক ঝাঁপিয়ে পড়ে তৈরি করলেন এক অবিশ্বাস্য মানবস্তূপ। ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ে।
নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর, নাটকীয় টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় গুস্তাভো আলফারোর শিষ্যরা। বিশ্বকাপে এই প্রথম টাইব্রেকারে হারের তেতো স্বাদ পেল জার্মানি; এর আগের পাঁচবারের প্রতিটিতেই তারা জিতেছিল। অন্যদিকে, দুইবার টাইব্রেকারে গিয়ে দুবারই শেষ হাসি হাসলো প্যারাগুয়ে।
পেনাল্টি শুটআউটে প্যারাগুয়ের জয়ের আসল নায়ক গোলরক্ষক ওর্লান্দো হিল। জার্মানির নেওয়া প্রথম পাঁচ শটের দুটিই ঠেকিয়ে দেন তিনি।
জার্মানির হয়ে প্রথম শট নিতে এসে ব্যর্থ হন কাই হাভার্টজ, তার দুর্বল শট সহজেই রুখে দেন হিল। তবে জার্মানির পরের দুই শটে জসুয়া কিমিখ ও জামাল মুসিয়ালা গোল করেন।
প্যারাগুয়ের প্রথম তিন শুটারই লক্ষ্যভেদ করেন। এরপর জার্মানির চতুর্থ শট নিতে আসা নক ভল্টেমাডাকেও হতাশ করেন গোলরক্ষক হিল।
চতুর্থ শটে গোল করলেই জয়—এমন সমীকরণে বল পোস্টের বাইরে মারেন প্যারাগুয়ের আন্তোনিও সানাব্রিয়া। জার্মানির পঞ্চম শটে নাদিম আমিরি গোল করলে আশা বেঁচে থাকে ডাই ম্যানশাফটদের। এরপর প্যারাগুয়ের ফাবিয়ান বালবুয়েনার নেওয়া পঞ্চম শটটি ঠেকিয়ে ম্যাচ সাডেন ডেথে নিয়ে যান জার্মান প্রাচীর মানুয়েল নয়ার।
সাডেন ডেথের শুরুতে জার্মানির ইয়োনাথান টাহ বল আকাশে উড়িয়ে মারলে প্যারাগুয়ের সামনে সুযোগ আসে ইতিহাস গড়ার। এবার আর ভুল করেননি কানালে; নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে এনে দেন ঐতিহাসিক এক জয়।
এর আগে ম্যাচের প্রথমার্ধে বল দখলে জার্মানি ৭৮ শতাংশ এগিয়ে থাকলেও প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণের সামনে কোনো সুবিধাই করতে পারেনি। গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করা ইউলিয়ান নাগেলসমানের দল প্রথমার্ধের ৫টি শটের একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের আগের ৫ ম্যাচে কোনো গোল ছিল না প্যারাগুয়ের। ৪২তম মিনিটে ডান দিক থেকে আসা এক চমৎকার ক্রসে বক্সে অরক্ষিত থাকা হুলিও এন্সিসো দারুণ হেডে গোল করে সেই দীর্ঘ খরা কাটান এবং প্যারাগুয়েকে এগিয়ে নেন (১-০)।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কিমিখের ভুলে দ্বিতীয় গোল পেতে পারত প্যারাগুয়ে, তবে এন্সিসোর চিপ শট রুখে দেন নয়ার। এরপর ৫৪তম মিনিটে ফ্লোহিয়ান ভিয়েৎসের দারুণ ক্রস থেকে হেডে গোল করে জার্মানিকে সমতায় ফেরান কাই হাভার্টজ (১-১)। ৭৮তম মিনিটে এই জুটির আরেকটি আক্রমণ চমৎকার দক্ষতায় নস্যাৎ করেন প্যারাগুয়ে কিপার হিল।
নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১০২তম মিনিটে কর্নার থেকে হেডে জার্মানির হয়ে বল জালে পাঠিয়েছিলেন ইয়োনাথান টাহ। তবে ভিএআর মনিটর দেখে রেফারি গোলটি বাতিল করেন, কারণ হেডের ঠিক আগে জার্মানির ভালদেমার আন্তন প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক হিলকে ফাউল করেছিলেন। ১১৯তম মিনিটে ভালদেমারের আরেকটি নিশ্চিত হেড রুখে দিয়ে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যান হিল।
জার্মানির বিপক্ষে তিনবারের দেখায় প্যারাগুয়ের এটিই প্রথম জয়। ২০১০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে ফিরে নকআউটের শুরুতেই অভাবনীয় এক সাফল্য পেল তারা। কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার তারা মুখোমুখি হবে ফ্রান্স অথবা সুইডেনের।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর গত দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল জার্মানি। এবার নকআউটে উঠলেও প্রথম ম্যাচেই বিদায়ের যন্ত্রণায় পুড়তে হলো তাদের। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে একুয়েডরের কাছে ২-১ গোলে হারের পর, প্যারাগুয়ের কাছে এই হার নাগেলসমানের দলের জন্য এক বড় ধাক্কা।
মন্তব্য করুন