
দৃশ্যমান অপবিত্রতা থেকে মানুষ অজু ও গোসলের মাধ্যমে বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন করে। তবে একজন মানুষের আত্মিক পবিত্রতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো হালাল উপার্জন। বৈধ ও সৎ পথে অর্জিত জীবিকা একজন মুমিনের বাহ্যিক জীবনের পাশাপাশি তার অন্তর ও আত্মাকেও পবিত্র রাখতে সহায়তা করে। উপার্জনের উৎস সৎ ও বিশুদ্ধ হলে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর বরকত লাভের আশা করা যায়।
তবে শুধু কঠোর পরিশ্রম করলেই উপার্জন হালাল হয়ে যায় না। উপার্জনের পদ্ধতি ও উৎসও শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হতে হয়। বর্তমান সমাজে অনেক মানুষ দিন-রাত পরিশ্রম করলেও তাদের উপার্জনের মাধ্যম অবৈধ বা হারাম হতে পারে। বস্তুবাদী জীবনের চাপে অনেকে দুর্নীতি, প্রতারণা, ভেজাল ও ওজনে কম দেওয়ার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
হারাম উপার্জনের মাধ্যমে মানুষ সাময়িকভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জন করতে পারে। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের ওপরই পড়ে। ইসলামী শিক্ষায় হারাম রুজিকে মানুষের ঈমান, আমল ও আখিরাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হারাম উপার্জনের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে যে শরীরের মাংস বৃদ্ধি পায়, জাহান্নামই তার জন্য অধিক উপযুক্ত। (জামে তিরমিজি: ৬১৪)
অন্য হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) আরও স্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন, ‘যে দেহ হারাম খাদ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছে, তা কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ: ১৮১০৯)
আমরা জীবনে কতবার হাত তুলে একান্তে কাঁদি, কান্নায় চোখের নোনা জল গড়িয়ে গণ্ডদেশ ভিজিয়ে ফেলি! মনে করি, এই বুঝি আমাদের ব্যাকুল আকুতি কবুল হয়ে গেল! কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সেই দোয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় না। এর মূল কারণ হারাম উপার্জন। হারাম রুজি মানুষের দোয়া কবুলের পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানবসকল, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ মুমিনদের ঠিক সেই নির্দেশই দিয়েছেন, যা তিনি দিয়েছিলেন তাঁর প্রেরিত রাসুলদের।...’
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির উদাহরণ দিলেন, যে দীর্ঘ সফর করে এসে ধূলিমলিন ও এলোমেলো চুলে আকাশের দিকে হাত তুলে আকুল হয়ে বলতে থাকে, ‘হে আমার রব, হে আমার রব!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং তার পুরো জীবিকাই অর্জিত হয়েছে হারাম উপায়ে। এ উদাহরণ দিয়ে রাসুল (সা.) সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, ‘এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে!’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
হারাম উপার্জন শুধু দোয়া কবুলের পথে বাধা সৃষ্টি করে না; এটি মানুষের নেক আমল ও ইবাদতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একজন মুসলমানের জন্য বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় হালাল রুজি অর্জনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়নীতি ও বৈধ পন্থা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করলে দুনিয়ায় শান্তি ও বরকতের পাশাপাশি আখিরাতের কল্যাণ লাভের পথও সুগম হয়।
মন্তব্য করুন