
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক ও অমানবিক ঘটনা। জমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার ‘অপরাধে’ রিনা খাতুন (২২) নামে এক গৃহবধূকে তালাক দিয়েছেন তাঁর স্বামী—এমন অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, নবজাতক দুই কন্যাসন্তানকে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে কাবিনের টাকা পরিশোধ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
ঘটনাটি উপজেলার নতুন কোলা গ্রামে। রিনা খাতুন ওই গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী।
পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে রাকিবুলের সঙ্গে রিনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর সুখেই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু রিনা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
রিনা জানান, গর্ভধারণের ছয় মাসের মাথায় আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে তাঁর গর্ভে জমজ কন্যাসন্তান রয়েছে বলে জানা যায়। এরপর থেকেই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আর কোনো খোঁজ নেননি স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা।
বাবার বাড়িতেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন রিনা। বর্তমানে শিশু দুটির বয়স দেড় মাস। অথচ জন্মের পর থেকে একবারও সন্তানদের দেখতে আসেননি তাদের বাবা। এমনকি ভরণপোষণের দায়িত্বও নেননি বলে অভিযোগ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বলেন,
“কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া নাকি আমার অপরাধ। এই অপরাধে আমাকে নির্যাতন করে তালাক দেওয়া হয়েছে। এখন আমার স্বামী বলছে, জমজ সন্তান বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আমার কাবিনের টাকা শোধ করবে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি মীমাংসার জন্য দুই দফা সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি। রাকিবুল ও তাঁর পরিবার রিনা এবং নবজাতক দুই কন্যাসন্তানকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে রিনার কাছে তালাকনামা পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, আধুনিক যুগে এসেও কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করার মানসিকতা সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে রাকিবুল ইসলামের বাড়িতে গেলে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর থেকেই রাকিবুল ও তাঁর বাবা আত্মগোপনে রয়েছেন।
মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া বা নির্যাতন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে অসহায় রিনা খাতুন এখন দুই নবজাতক কন্যাসন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাঁর একটাই আবেদন—দুই মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, আর এই অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার করা হোক।
মন্তব্য করুন