
ইলিশের রাজত্ব ধরে রাখা এক সময়কার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছ ঘাট এখন দখল নিয়েছে পদ্মা-মেঘনা নদীর বড় আকারের পাঙাশ।
এক সময়ে ইলিশে ভরপুর থাকা এই মাঝঘাটে ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মাছের পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকত এই মাছঘাটটি।
কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও ইলিশ ব্যবসায়ী আর দূর দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের হাকডাকের চেনা দৃশ্য একেবারেই নেই বললেই চলে। এখন পুরো ঘাটজুড়েই সারি সারি বড় আকারের নদীর পাঙাশ ইলিশের পরিবর্তে শোভা পাচ্ছে ঘাটে ।
জেলেদের জালে প্রত্যাশিত ইলিশ না ধরা পড়ায় পদ্মা–মেঘনা নদী থেকে উঠে আসা বড় বড় পাঙাশই এখন জমিয়ে রেখেছে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছের এই পাইকারী বাজার।
মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য মতে, প্রতিদিন এই ঘাটে একশ থেকে দেড়শটি বড় আকারের নদীর পাঙাশ কেনাবেচা হচ্ছে। একসময় যেখানে ইলিশ কিনতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন অনেক ক্রেতাই একটি বড় ইলিশের সমমূল্যে একটি বড় পাঙাশ কিনে বাড়ি ফিরছেন।
চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছ ঘাট ঘুরে দেখা যায়, আড়তজুড়ে সারি সারি বিশাল আকৃতির পাঙাশ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আকারভেদে প্রতিটি মাছের ওজন ৮ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত। ইলিশের তুলনায় দাম কম হওয়ায় এসব মাছ কিনতে ক্রেতাদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো।
ঘাটের বড় পাঙাশের আড়তদার মো. হাসান বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে ইলিশের চাহিদা অনেকটাই মেটাচ্ছে নদীর পাঙাশ। কারণ, জেলেদের জালে এখন বড় বড় পাঙাশ ধরা পড়ছে। ইলিশ কম থাকায় ক্রেতারাও পাঙাশের দিকে ঝুঁকছেন। প্রতিদিনই ভালো বেচাকেনা হচ্ছে।
মাছ ব্যবসায়ী নবীর হোসেন বলেন, নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ায় আমাদের ব্যবসা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বড় বড় পাঙাশ ধরা পড়ায় সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে যাচ্ছে। এখন পাঙাশই আমাদের ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছে।
দীর্ঘদিনের মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় কয়েক দিন ধরে যেভাবে বড় পাঙাশ ধরা পড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে নদীতে এখনও ভালো পরিমাণ পাঙাশ রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বড় মাছের পাশাপাশি ছোট পাঙাশও ধরা পড়ছে। এখন যদি ছোট পাঙাশ ধরা বন্ধ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইলিশের মতো পাঙাশেরও সংকট দেখা দিতে পারে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে বড় আকারের ইলিশের দাম অনেক বেশি হওয়ায় অনেকেই বিকল্প হিসেবে নদীর পাঙাশ কিনছেন। স্বাদ ও আকারের কারণে বড় নদীর পাঙাশের প্রতি তাঁদের আগ্রহও বাড়ছে।
মাছঘাটের ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি মৌসুমে পদ্মা–মেঘনা নদীতে প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ ধরা না পড়ায় পুরো বাজারের চিত্রই বদলে গেছে। ইলিশের ঘাট হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছ ঘাটে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নদীর পাঙাশ। তবে তাঁরা মনে করছেন, নদীতে ছোট আকারের পাঙাশ নির্বিচারে আহরণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এই মাছের উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
চাঁদপুর শহরের পালবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদের বলেন, পরিবারের জন্য বড় একটি ইলিশ কিনতে এসে দাম শুনে আর কেনা হয়নি। পরে একই টাকায় বড় একটি নদীর পাঙাশ কিনেছি। ইলিশের মতো স্বাদ না হলেও পরিবারের সবাই মিলে খাওয়া যাবে। ইলিশের দাম যত দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবে, তত দিন অনেকেই আমার মতো পাঙাশকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নেবেন।
ইলিশের জন্য খ্যাত চাঁদপুরের এই ঐতিহ্যবাহী ঘাটে তাই আপাতত ইলিশের জায়গা দখল করে নিয়েছে নদীর বড় পাঙাশ। ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল আর পাঙাশের প্রাচুর্য- দুই বিপরীত চিত্রই এখন ঘাটজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়।
এদিকে, চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দাম এখনো চড়া। আড়তদারদের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা এবং ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি বা তার বেশি ওজনের বড় ইলিশ ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মানভেদে কিছু ইলিশের দাম আরও বেশি।
অন্যদিকে, পদ্মা–মেঘনা নদীতে ধরা পড়া বড় আকারের পাঙাশের চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে বড় নদীর পাঙাশ প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা, মাঝারি আকারের পাঙাশ ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং ছোট পাঙাশ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেকেই এখন বিকল্প হিসেবে নদীর পাঙাশ কিনছেন। তুলনামূলক কম দামে বড় আকারের মাছ পাওয়ায় প্রতিদিনই পাঙাশের বিক্রি বাড়ছে। একসময় যে ঘাটে ইলিশ কেনার জন্য ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে নদীর বড় পাঙাশ।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, পদ্মা-মেঘনা নদীতে বর্তমানে বড় আকারের পাঙাশ ধরা পড়া নদীর জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদের জন্য ইতিবাচক একটি লক্ষণ। এতে জেলেরা ইলিশের পাশাপাশি বিকল্প মাছ বিক্রি করে ভালো দাম পাচ্ছেন এবং বাজারে মাছের সরবরাহও স্বাভাবিক থাকছে। সাধারণ ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে বড় আকারের মানসম্মত মাছ কিনতে পারছেন। আমরা আশা করছি, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সরকারের চলমান কার্যক্রম এবং জেলেদের সচেতনতার কারণে ভবিষ্যতেও নদীতে ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে।
মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, বড় মাছের পাশাপাশি যদি অপরিপক্ব বা ছোট পাঙাশও নির্বিচারে আহরণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নদীতে পাঙাশের উৎপাদন ও মজুদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রজননক্ষম ও ছোট আকারের মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর এলাকার জেলে মো. জসিম মাঝি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে নদীতে ইলিশের তুলনায় বড় বড় পাঙাশ বেশি ধরা পড়ছে। একটি বড় পাঙাশ বিক্রি করেই ভালো টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এতে ইলিশ কম পেলেও সংসার চালাতে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। আমরা চাই, নদীতে ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশসহ সব দেশীয় মাছের উৎপাদন আরও বাড়ুক, যাতে জেলেরা সারা বছরই ভালো আয় করতে পারেন।
হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী এলাকার জেলে মো. সেলিম বেপারী বলেন, আগে পাঙাশ খুব একটা জালে উঠত না। এখন প্রায় প্রতিদিনই বড় আকারের পাঙাশ পাচ্ছি। আড়তে এর ভালো চাহিদা রয়েছে, তাই মাছ বিক্রি নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ইলিশ কম থাকলেও পাঙাশ আমাদের লোকসান অনেকটাই পুষিয়ে দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন