
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বহুল আলোচিত মামলায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করে খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ইতোমধ্যে আইনি পর্যালোচনার জন্য এই খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট ব্যবহার করে ভুয়া পেমেন্ট নির্দেশনা পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করা হয়।
এই ঘটনায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের সাতটি দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে: ফিলিপাইনের ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের ১০ জন, নর্থ কোরিয়ার ২ জন, চীনের ৩ জন, শ্রীলঙ্কার ৮ জন, ভারতের ৪ জন, জাপানের ১ জন।
সিআইডির প্রস্তুত করা প্রায় ১৫০ পৃষ্ঠার খসড়া অভিযোগপত্রে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক তদন্ত তথ্য, অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক এবং অভিযুক্তদের ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। মামলার সমর্থনে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র ও প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন: সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভংকর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ। ভারতের কয়েকজন অভিযুক্তের নামও তালিকায় রয়েছে।
এছাড়া ভারতের কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামও অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিআইডির ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শতভাগ তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফরেনসিক তদন্তে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সহায়তায় নর্থ কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক এবং কুখ্যাত সাইবার অপরাধী সংগঠন ‘লাজারাস গ্রুপ’-কে এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থ প্রবাহ এবং গন্তব্যও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারীরা।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ পরিচালিত হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হলে এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সংঘটিত বড় ধরনের সাইবার ও আর্থিক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
মন্তব্য করুন