
২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতারের দোহায় বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে লিওনেল মেসির সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। কালো আলখেল্লা পরে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছিল তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সেই জয়ের মধ্য দিয়েই পেলে ও ম্যারাডোনার পাশে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখিয়ে নেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে আর্জেন্টিনা। নতুন আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অভিযান শুরু হবে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৭টায়। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ আফ্রিকার শক্তিশালী দল আলজেরিয়া।
এবারের বিশ্বকাপ শুধু শিরোপা রক্ষার মিশন নয়, এটি হতে পারে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপও। ফলে আর্জেন্টিনা ঘিরে সমর্থকদের আবেগ, প্রত্যাশা এবং আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
কোচ লিওনেল স্কালোনির দলকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিপূর্ণ দলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে গড়া এই দল বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর পাশাপাশি রয়েছেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নাহুয়েল মলিনা, গনসালো মন্টিয়েল, ফাকুন্দো মেদিনা এবং উদীয়মান তারকা ভ্যালেন্টিন বারকো।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও আর্জেন্টিনার শক্তিমত্তার প্রমাণ দিচ্ছে। সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে দলটি, বিপরীতে করেছে ১৪ গোল। ফলে তাদের রক্ষণভাগ ভাঙা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যমাঠে রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজের সমন্বয় দলকে দিয়েছে দারুণ ভারসাম্য। অন্যদিকে আক্রমণভাগে মেসির সঙ্গে রয়েছেন জুলিয়ান আলভারেজ ও লটারো মার্টিনেজ। বেঞ্চ শক্তিতেও রয়েছে তারুণ্যের ছাপ, যেখানে সুযোগের অপেক্ষায় আছেন ম্যানুয়েল লোপেজ, সিমিওনে ও গনসালেসরা।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২৭ নম্বরে থাকা আলজেরিয়া কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের ইতিহাসে তারা একাধিকবার চমক দেখিয়েছে।
১৯৮২ বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল আলজেরিয়া। পরে ২০১৪ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে নকআউট পর্বেও জায়গা করে নিয়েছিল দলটি।
দীর্ঘ বিরতির পর আবার বিশ্বকাপে ফেরা আফ্রিকার প্রতিনিধিরা এবারও নতুন কোনো চমক উপহার দিতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার অতীত খুব সুখকর নয়।
১৯৭৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ১৯৮২ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল। একইভাবে ১৯৮৬ সালের চ্যাম্পিয়ন দল ১৯৯০ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে একই ব্যবধানে পরাজিত হয়।
শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসে শিরোপাধারী দলগুলোর জন্য প্রথম ম্যাচ প্রায়ই কঠিন পরীক্ষার নাম। গত ২১টি বিশ্বকাপে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের প্রথম ম্যাচে ছয়বার হেরেছে, চারবার ড্র করেছে এবং জয় পেয়েছে ১০ বার।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে নিজের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি ছবি পোস্ট করে মেসি লিখেছেন, “আরেকটি ইতিহাস”।
সংক্ষিপ্ত এই বার্তার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে পুরো আর্জেন্টিনার স্বপ্ন। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নতুন যাত্রা কি জয় দিয়ে শুরু হবে? নাকি আলজেরিয়া আবারও বিশ্বকাপকে মনে করিয়ে দেবে যে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোনো গল্পই আগে থেকে লেখা থাকে না?
উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে আপাতত বিশ্ব ফুটবলের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এক ব্যক্তির দিকে—লিওনেল মেসি। তার হাত ধরেই কি আবারও ইতিহাস রচনা করবে আর্জেন্টিনা, সেটাই এখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর অপেক্ষার বিষয়।
মন্তব্য করুন