
‘ক্রিং... ক্রিং...’ রিং (কল) বেজে উঠতো টেলিফোনে। এখনো রিং বাজে, তবে টেলিফোনের সংখ্যা কমেছে ব্যাপকহারে। এক সময় বাসা-বাড়ি কিম্বা ড্রয়িং রুমের শোভাবর্ধনকারী আভিজাত্যের শেষ কথা ছিল যে টেলিফোন; প্রযুক্তির প্রবল স্রোতে আজ তা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে বসেছে। দুই যুগ আগেও বাংলাদেশে যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম ছিল ‘টিঅ্যান্ডটি’ বা ল্যান্ডফোন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মুঠোফোনের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট বিপ্লবের মুখে ল্যান্ডফোনের সেই সুদিন এখন ধূসর স্মৃতি হতে চলেছে।
তথ্য বলছে, এক সময় মাগুরা জেলায় টেলিফোন সংযোগ নেয়ার জন্য গ্রাহকদের ঘুরতে হতো, অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। অথচ দেড় দশক আগের দুই সহস্রাধিক গ্রাহকের সেই মাগুরায় এখন টিকে আছে মাত্র ৭৫৩টি। উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে এই ধসের চিত্র আরও স্পষ্ট। মাগুরা সদর উপজেলায় এক সময় যেখানে দেড় হাজার গ্রাহক ছিল, সেখানে বর্তমানে আছে মাত্র ৬৩০ জন। মহম্মদপুর উপজেলায় ২০০-এর অধিক গ্রাহক কমে এখন মাত্র ৪৭ জনে ঠেকেছে। শ্রীপুর উপজেলায় শতাধিক গ্রাহকের স্থলে এখন মাত্র ৩৭ এবং শালিখা উপজেলায় তিন শতাধিক গ্রাহকের স্থলে এখন মাত্র ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। মাগুরায় টেলিফোন বা ল্যান্ডফোনের গ্রাহক সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
অভিজ্ঞজনরা বলছেন, প্রযুক্তির প্রসারে এখন মানুষ হাতের নাগালে মোবাইল। তাৎক্ষণিক যোগাযোগের এই যুগে নির্দিষ্ট স্থানে বসে থাকার ল্যান্ডফোন তাই গুরুত্ব হারিয়েছে। কারণ ল্যান্ডলাইনের সামনে মানুষ সব সময় বসে থাকেন না। হাতে হাতে মোবাইল থাকায় যোগাযোগ সহজ হয়ে গেছে। যাকে দরকার মোবাইল ফোনে কল করে তাকে সহজেই পাওয়া সম্ভব।
টেলিফোন একসময় সমধিক পরিচিত ছিল টিঅ্যান্ডটি ফোন নামে। বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি) একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তখন। ২০০৮ সালে বিটিটিবি বিলুপ্ত করে গঠিত হয় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। কিন্তু এই প্রশাসনিক পরিবর্তনও গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় কোনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনা এবং মোবাইল ফোনের সঙ্গে গতির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হাত গুটিয়ে বসে নেই বিটিসিএল। গ্রাহক টানতে প্রতিষ্ঠানটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেদের উপস্থাপন করছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আধিপত্য বিস্তারে প্যাকেজের দাম অপরিবর্তিত রেখে ইন্টারনেটের গতি তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। চালু করা হয়েছে আধুনিক ‘আইপি কলিং’ সেবা ‘আলাপ’, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা সাড়া ফেলছে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান যুগে শুধু ভয়েস কল দিয়ে গ্রাহক ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই ‘জিপন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে একই সংযোগে উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং টেলিফোন সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দাবি, ইন্টারনেটের প্রয়োজনে নতুন করে গ্রাহক বাড়ছে এবং ল্যান্ডফোনকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। মাগুরা ও নড়াইল বিটিসিএল টেলিকমের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, “ল্যান্ডলাইনের সামনে মানুষ সব সময় বসে থাকেন না। হাতে হাতে মোবাইল থাকায় যোগাযোগ সহজ হয়ে গেছে। তবে আমরা আধুনিক প্রযুক্তিবান্ধব সেবা দিয়ে এই ব্যবধান কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।”
যশোর বিটিসিএল টেলিকমের উপ-মহাব্যবস্থাপক (অ.দা.) হিমাংশু হালদার বলেন, “প্রযুক্তির প্রসারে এখন মানুষ হাতের নাগালে মোবাইল পাচ্ছে। তাৎক্ষণিক যোগাযোগের এই যুগে নির্দিষ্ট স্থানে বসে থাকার ল্যান্ডফোন তাই গুরুত্ব হারাচ্ছে।”
তথ্য বলছে, গত এক যুগে দেশজুড়ে টেলিফোনের গ্রাহক সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫ লাখ। আভিজাত্যের প্রতীক থেকে এটি এখন অনেকটা ‘শো-পিসে’ পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে দেশে টেলিফোন গ্রাহকের সংখ্যা ছিল সাড়ে আট লাখ। এক যুগের ব্যবধানে ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র সাড়ে তিন লাখে। প্রযুক্তির বিবর্তনে টেলিফোনকে এনালগ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর ঘটালেও মোবাইল ফোনের রাজত্বে এই ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমটিকে এখন টিকিয়ে রাখার জন্য নানা পরিকল্পনা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
মন্তব্য করুন