
ইসরায়েলের কারাগার ও আটককেন্দ্রগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক, মানসিক এবং অপমানজনক নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে আলজাজিরার একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে। কাতারভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত “বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েল’স ডার্কেস্ট ওয়েপন” শিরোনামের প্রতিবেদনে সাবেক বন্দি, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন নথির ভিত্তিতে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছে, আটক ফিলিস্তিনিদের চোখ ও হাত-পা বেঁধে, অনেক সময় বিবস্ত্র করে রাখা হতো এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। কিছু সাবেক বন্দির বক্তব্য অনুযায়ী, নির্যাতনের অংশ হিসেবে কুকুর ব্যবহার করা হতো, যা ভয়ভীতি দেখানো এবং অপমানের একটি কৌশল হিসেবে প্রয়োগ করা হতো।
গাজার খান ইউনিসের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি প্রায় ২০ মাস আটক ছিলেন বলে সাক্ষাৎকারে জানান। তার দাবি অনুযায়ী, তাকে বিভিন্ন আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা আরও কয়েকজন সাবেক বন্দিও জানিয়েছেন।
কিছু সাবেক বন্দির বক্তব্যে যৌন সহিংসতা ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগও উঠে এসেছে। তাদের দাবি, এসব আচরণ বন্দিদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হতো। যদিও এসব অভিযোগের বেশিরভাগই নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করা সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে আসেন না, ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
আলজাজিরার অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় ও স্থানে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাওয়ায় এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। বিশেষ করে সদে তেইমান আটককেন্দ্রকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকসহ বিভিন্ন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বন্দিদের বিরুদ্ধে মারধর, চিকিৎসা বঞ্চনা, একাকী কারাবাস ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ একসঙ্গে ব্যবহৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তথ্যচিত্রে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু সহিংস ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি অনুযায়ী, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামে হামলা চালিয়ে মারধর, লুটপাট এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। জীবিকার উৎস হিসেবে থাকা পশুও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ফিলিস্তিনি সূত্র অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আটক ও কারাবাসের তথ্য পাওয়া যায়, যা ফিলিস্তিনি সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস জানিয়েছে, তারা আইন অনুযায়ী এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে কাজ করে থাকে এবং বন্দিদের অধিকার রক্ষা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতও দাবি করেছেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগতভাবে তদন্ত করা উচিত এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হবে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক বন্দিদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত বা বিচার খুব কমই হয়েছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।
মন্তব্য করুন