শুক্রবার
০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

ভারতে মুসলিম নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ এএম
ভারতে মুসলিম নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বৈষম্য এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলার অভিযোগ বেড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর ওড়িশা, ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি ও আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।

প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও বাংলাদেশি সন্দেহে পরিচয়পত্র দেখানোর পরও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে, কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের সময় বাড়িঘর, দোকানপাট ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনাও রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শুধু শারীরিক হামলাই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মুসলিমদের একটি অংশ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। কর্মসংস্থান, বাসস্থান, ধর্মীয় আচার পালন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই উদ্বেগ বাড়ছে বলে তারা উল্লেখ করেছে।

বিশেষ করে জীবিকার সন্ধানে অন্য রাজ্যে যাওয়া দরিদ্র মুসলিম শ্রমিকদের অনেকেই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সংগঠনগুলোর মতে, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা নয়, বরং একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে।

তাদের ভাষ্য, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং বৈষম্যহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ বেড়েছে। এসব প্রতিবেদনে বাংলাদেশি পরিচয়ের অভিযোগ তুলে শ্রমিকদের হুমকি, হামলা এবং কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনাও উঠে এসেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওড়িশাসহ কয়েকটি রাজ্যে মুসলিম শ্রমিকদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক শ্রমিক কাজ ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

কিশোরীকে গাছে ঝুলিয়ে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা, মুসলীম যুবকদের দেহ থেকে মাথা আলদা করে বিছন্ন দেহ নিয়ে উল্লাস করা, প্রকাশ্যে রাস্তায় নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, বৃদ্ধ মুসলিমদের দাঁড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে নির্যাতনসহ নানা ধরণের নির্যাতন চলছে। বাংলাদেশি পরিচয়ের তকমা লাগিয়ে হামলা ও ভয়-ভীতি দেখানোর ঘটনায় অনেকেই কাজ ছেড়ে নিজ রাজ্যে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে জীবিকার সংকটে পড়ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র মুসলীম শ্রমিকরা। এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে বহু শ্রমিক জীবিকার সংকটে পড়ছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায় বৈষম্যমূলক আচরণ, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সহিংসতার শিকার হয়েছে।

এসব প্রতিবেদনে গরু পাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি, ধর্মীয় মিছিল ঘিরে সংঘর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের পর হামলা, উপাসনালয়ে আক্রমণ এবং উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এছাড়া কিছু রাজ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে মুসলিমদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া, ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।

অন্যদিকে ভারত সরকার বরাবরই বলে আসছে, দেশটির সংবিধান সব নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ করে।

সরকারের দাবি, বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনাকে রাষ্ট্রের সামগ্রিক নীতির প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো অপরাধ বা সহিংসতার ঘটনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুজাতিক সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, ঘৃণামূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক উত্তেজনা ও অবিশ্বাস কমানো সম্ভব হবে।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্যনির্ভর আলোচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তই বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

চোর অপবাদ ও ধাওয়া দিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ ভারতে চোর সন্দেহ, গবাদিপশু চুরি কিংবা শিশু অপহরণের গুজবÑ এমন নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি ও জনতার হামলার ঘটনা গত এক দশকে উদ্বেগজনকভাবে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশে মুসলিমরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণের আগেই জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হামলা চালিয়েছে, যার পরিণতিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক সময় এসব হামলার পেছনে ভূমিকা রাখে। কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলেই বা সন্দেহ তৈরি হলেই তাকে ঘিরে ধরে মারধরের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে পরে দেখা গেছে, অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণই ছিল না।

সমালোচকদের মতে, গণপিটুনির শিকারদের একটি বড় অংশ মুসলিম হওয়ায় ঘটনাগুলোকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। তাদের দাবি, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ঘৃণা ও বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার প্রবণতাও এসব সহিংসতার অন্যতম কারণ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ঘটনায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। কোথাও কোথাও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায় বলে তারা মনে করে। বিশ্লেষকদের মতে, গুজব, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি- এই তিনের সমন্বয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধ এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই এ ধরনের ঘটনা কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

বাংলাভাষী মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করার টার্গেট! ভারতে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব, পরিচয় ও বসবাসের অধিকার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি), সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলো ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে “বাংলাভাষী মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করার টার্গেট” রয়েছে- এটি একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক দাবি, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।

সমালোচকদের অভিযোগ, নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় বাংলাভাষী মুসলিমদের তুলনামূলক বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও বলেছে, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বহু বছরের পুরোনো নাগরিকত্বের কাগজপত্র সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক হয়েও অনেকে সন্দেহের মুখে পড়ছেন।

বিশেষ করে আসামে এনআরসি প্রকাশের পর প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। বাদ পড়াদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম- উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল ও আদালতের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দাবি করার সুযোগ রাখা হয়। এ কারণে অনেকেই বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি অংশ বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। একদিকে সীমান্ত ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে রাষ্ট্রের আইনগত অবস্থান রয়েছে, অন্যদিকে মানবাধিকার, বৈষম্যহীনতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে মুসলিমদের নামাজে বাধা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের নামাজ আদায়কে কেন্দ্র করে একাধিক বিতর্ক ও উত্তেজনার ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় জুমার নামাজ, ঈদের জামাত এবং কিছু মসজিদকে ঘিরে বিরোধের কারণে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও মুসলিম প্রতিনিধিদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব পদক্ষেপ জনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবহার এবং আদালতের নির্দেশনা মেনেই নেওয়া হয়েছে।

উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড ও দিল্লির আশপাশের কয়েকটি এলাকায় খোলা স্থানে জুমার নামাজ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মুসলিমদের মতবিরোধ দেখা যায়। কোথাও কোথাও অনুমতি না থাকায় খোলা জায়গায় নামাজ বন্ধ করা হয়েছে, আবার কিছু এলাকায় স্থানীয় গোষ্ঠীর প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসে।

মুসলিম সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত মসজিদ না থাকায় বাধ্য হয়েই খোলা জায়গায় নামাজ আদায় করতে হয়। তাদের দাবি, প্রশাসন বিকল্প ব্যবস্থা না করে নামাজে বিধিনিষেধ আরোপ করলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের মুখে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার এবং যেকোনো বিধিনিষেধ হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও বৈষম্যহীন। তাদের মতে, কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলে তা সংবিধানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো বহুধর্মীয় সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জনশৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ বাড়ানো গেলে অনেক বিরোধ এড়ানো সম্ভব।

ভারতে মসজিদ ভাঙা ও মন্দির-মসজিদ বিরোধ ভারতে মসজিদ ভাঙা, উচ্ছেদ অভিযান এবং ঐতিহাসিক উপাসনালয় নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি সংবেদনশীল বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অংশ হিসেবে কিছু মসজিদ বা মসজিদের অংশ ভেঙে দেওয়ার ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদকে কেন্দ্র করে মন্দিরের দাবিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, আদালতের লড়াই এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা- সবই সমান্তরালে চলছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর কয়েক হাজার করসেবক মসজিদটি ভেঙে ফেলেন, যার পর সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত জমিতে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয় এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে অন্যত্র পাঁচ একর জমি বরাদ্দের নির্দেশ দেয়। রায়টি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে সেখানে রামমন্দির নির্মিত হয়েছে। এছাড়া উত্তর প্রদেশের জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদকে ঘিরেও আদালতে মামলা চলছে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ ও অন্যান্য কিছু রাজ্যে সড়ক, রেলপথ বা সরকারি জমিতে অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদের সময় মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসনের দাবি, এগুলো ছিল অবৈধ দখল উচ্ছেদের অংশ। তবে মুসলিম সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, একই ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রে সবসময় সমান নীতি অনুসরণ করা হয় না এবং কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম উপাসনালয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এবং আদালতের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি। একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়াই একটি বহুধর্মীয় গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আসছে সূর্যগ্রহণ, দিনের বেলায় নামবে অন্ধকার

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প?

গাজা সীমান্তে জনবসতি বাড়াতে ইসরায়েলের নতুন পরিকল্পনা

গাজা যুদ্ধের ১০০০ দিন: ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

আশাশুনিতে ১৪ লাখ টাকার অপদ্রব্যযুক্ত বাগদা চিংড়ি জব্দ, দুই ব্যবসায়ীর পলায়ন

বাঘারপাড়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী ও ছাত্রলীগ নেতা রাব্বী আটক

সুন্দরবনে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর সরঞ্জাম জব্দ

শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাংলাদেশকে ৯৯ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে জিপিই

নড়াইলে চোর সন্দেহে গাছে বেঁধে নির্যাতন, প্রতিবন্ধী যুবকের মৃত্যু

বারান্দীপাড়ার আলোচিত হীরা আটক

মণিরামপুরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ

অভয়নগরে প্রথম দিনে পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুপস্থিত ৪১ জন

শার্শায় পুলিশের অভিযানে ৭টি চোরাই মোবাইল উদ্ধার, যুবক গ্রেপ্তার

যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীতে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের স্মারকলিপি

সুনামগঞ্জে হাওর, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ‘হাওর উন্নয়ন ভাবনা’ অনুষ্ঠিত

মোংলায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু, রোপণ হবে ৩৫ হাজার চারা

মহেশপুর পৌরসভায় কার্যালয়ে তালা দেওয়ার অভিযোগ

মহেশপুরে ৯৯০ কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ ও বৃক্ষরোপণ সামগ্রী বিতরণ

পলাশবাড়ীতে নির্মিত রামমূর্তি অপসারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

শার্শার দুই কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ এইচএসসি পরীক্ষা

X