
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে বিশ্বজগতের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। এসব আয়াত মানুষের সামনে তুলে ধরে যে, এই বিশাল মহাবিশ্ব কোনো খেলাচ্ছলে বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করা হয়নি; বরং এর পেছনে রয়েছে মহান স্রষ্টার অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনা।
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَ مَا خَلَقۡنَا السَّمَآءَ وَ الۡاَرۡضَ وَ مَا بَیۡنَهُمَا لٰعِبِیۡنَ ﴿۱۶﴾ لَوۡ اَرَدۡنَاۤ اَنۡ نَّتَّخِذَ لَهۡوًا لَّاتَّخَذۡنٰهُ مِنۡ لَّدُنَّاۤ اِنۡ كُنَّا فٰعِلِیۡنَ
সরল অনুবাদ: আসমান-জমিন ও তাদের মধ্যখানে যা কিছু আছে তার কোনো কিছুই আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি খেলার উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম, তাহলে আমার কাছে যা আছে তা দিয়েই করতাম। (সুরা আম্বিয়া: ১৬-১৭)
আয়াতের ব্যাখ্যা তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াত মূলত তাদের ধারণার জবাব, যারা মনে করে পার্থিব জীবনই সবকিছু এবং মৃত্যুর পর কোনো জবাবদিহি বা আখেরাত নেই।
যদি আখেরাত না থাকে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের কর্মের কোনো ফলাফল নেই। অর্থাৎ, সৎকর্মের জন্য কোনো পুরস্কার এবং অসৎকর্মের জন্য কোনো শাস্তি থাকবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের ধারণা আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
প্রখ্যাত আলেম মুফতি তাকি উসমানি তাঁর তাওজিহুল কোরআন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলার প্রতিটি সৃষ্টি গভীর উদ্দেশ্য ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই বিশ্বজগতকে নিছক খেলা হিসেবে বিবেচনা করা গুরুতর ভ্রান্তি।
কেন সৃষ্টি করা হয়েছে আসমান ও জমিন? তাফসিরে আহসানুল বায়ান-এ উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো— মানুষ যেন সৃষ্টিজগতের নিদর্শন দেখে আল্লাহকে স্মরণ করে। স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা ও মহিমা উপলব্ধি করে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ঈমান ও তাকওয়া অর্জনের পথে পরিচালিত হয়।
"লাহও" শব্দের তাৎপর্য
আয়াতে ব্যবহৃত "লাহও" (لَهْوًا) শব্দের অর্থ হলো এমন কাজ, যা শুধুমাত্র বিনোদন, রং-তামাশা বা উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানোর জন্য করা হয়।
তাফসিরকারগণ বলেন, এত সুবিন্যস্ত, সুপরিকল্পিত এবং বিস্ময়কর সৃষ্টি কখনোই খেলাচ্ছলে হওয়া সম্ভব নয়। মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে যে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য বিদ্যমান, তা সৃষ্টিকর্তার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও পরিকল্পনার প্রমাণ বহন করে।
অন্যদিকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে "লাহও" শব্দটি স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততির অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ ব্যাখ্যার আলোকে আয়াতটি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সেই দাবিরও জবাব দেয়, যেখানে তারা যথাক্রমে উযায়ের (আ.) ও ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করত।
ইবনে কাসির ও ফাতহুল কাদির-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন, তাহলে তিনি তাঁর নিকটবর্তী কোনো সৃষ্টিকে গ্রহণ করতে পারতেন। মানুষের মতো সৃষ্টিকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।
আয়াত থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও বিধান
১. আল্লাহর কোনো কাজই উদ্দেশ্যহীন নয় আল্লাহ তাআলা নিরর্থক ও অনর্থক কাজ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁর প্রতিটি কাজ জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে সংঘটিত হয়।
২. আল্লাহ সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন এবং কারো ওপর নির্ভরশীল নন। বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল।
৩. মানুষের জীবনও উদ্দেশ্যময় হওয়া উচিত যেহেতু আল্লাহর কোনো সৃষ্টি অর্থহীন নয়, তাই মানুষের জীবনও লক্ষ্যহীন ও উদ্দেশ্যহীন হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি মানুষকে তার জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
৪. পৃথিবী পরীক্ষা, খেলাধুলার স্থান নয় এই আয়াত মানুষের সামনে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবী স্থায়ী আবাস নয়; এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। তাই আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
সুরা আম্বিয়ার ১৬-১৭ নম্বর আয়াত মানবজাতিকে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—এই বিশ্বজগত এবং মানবজীবন কোনো দুর্ঘটনা বা খেলাচ্ছলে সৃষ্ট নয়। আল্লাহ তাআলা সবকিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে সৃষ্টি করেছেন। তাই একজন মুমিনের উচিত আসমান-জমিনের নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, আখেরাতের জবাবদিহিতার প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জীবন পরিচালনা করা।
মন্তব্য করুন