
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে নিউইয়র্কে আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গনের ক্রীড়া কিংবদন্তিদের সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা গেল আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসিকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকান ফুটবলের কিংবদন্তি টম ব্র্যাডি, টেনিসের সর্বাধিক গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী নোভাক জোকোভিচ এবং পুরুষ বাস্কেটবলে চারবারের অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী কেভিন ডুরান্ট।
তবে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল মেসিকে ঘিরে অন্য ক্রীড়া তারকাদের আগ্রহ। অনুষ্ঠান শেষে ব্র্যাডি, জোকোভিচ ও ডুরান্টসহ তারকারা মেসির সঙ্গে স্মরণীয় ছবি তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই দৃশ্য ফুটবলের এই মহাতারকার প্রতি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
রোববার বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ দেখতে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক অপেক্ষায় রয়েছেন। ফাইনালের আগে মেসি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেব।’
বিশেষ এই অনুষ্ঠানটি ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে মেসির শেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি। নিউইয়র্কে ফিফা আয়োজিত চার দিনের ক্রীড়া উৎসবকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী ফাইনাল-পূর্ব আয়োজন। এর ফলে সাধারণ দর্শকরাও কাছ থেকে মেসিকে দেখার বিরল সুযোগ পান।
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি মেসির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘মেসি একজন ফুটবলার হিসেবে কী, আর আর্জেন্টিনার জন্য কী—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার কাছে তিনি সর্বকালের সেরা।’
অনুষ্ঠানটির ধরন ছিল ভিন্ন। প্রচলিত সংবাদ সম্মেলনের পরিবর্তে বিশ্বের খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদরাই প্রশ্ন করেন দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদের।
নোভাক জোকোভিচ প্রথমে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির কাছে চাপ সামলানোর কৌশল জানতে চান। পরে একই ধরনের প্রশ্ন করেন মেসিকেও। মেসির উত্তর শেষে তিনি বলেন, ‘ধন্যবাদ, লিও।’
এরপর তিনি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও অধিনায়ক রদ্রির কাছে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কীভাবে শান্ত থাকা যায়, সে বিষয়ে জানতে চান। টম ব্র্যাডি মেসির কাছে লামিন ইয়ামালের সঙ্গে তার বহুল আলোচিত পুরোনো ছবির প্রসঙ্গ তোলেন। অন্যদিকে রদ্রিকে জিজ্ঞেস করেন, ফাইনালের আগে সতীর্থদের কী বলবেন তিনি। পরে কেভিন ডুরান্ট আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের কাছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনার অনুভূতি জানতে চান।
পুরো অনুষ্ঠানটি আর্জেন্টিনা ও স্পেন—দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচরাই উপভোগ করেছেন। বিশ্বকাপের ফাইনাল যেমন বড় এক আয়োজন, তেমনি এই অনুষ্ঠানও ছিল আকর্ষণীয়।
স্কালোনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য আরেকটি ম্যাচ মাত্র। আমরা শুধু এটা ভেবে মাঠে নামতে পারি না যে এটি বিশ্বকাপের ফাইনাল।’
শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকলেও শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও দ্বিতীয়ার্ধে পিছিয়ে থেকে জয় তুলে নিতে হয়েছে। এছাড়া কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে তাদের।
মেসি বলেন, ‘আমি অনেকবার বলেছি, আমরা কখনোই লড়াই থামাই না।’
অনুষ্ঠানে মেসি মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকদের বেশিরভাগ করতালি দেওয়ার বদলে মোবাইল ফোন তুলে সেই মুহূর্তটি ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেসিও তাদের প্রত্যাশা বুঝে হাসিমুখে হাত নাড়েন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো মিলনায়তন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে।
অনুষ্ঠান শেষে খেলোয়াড়, কোচ, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী এবং অন্যান্য অতিথিরা একসঙ্গে দর্শকদের পেছনে রেখে স্মরণীয় একটি দলীয় ছবি তোলেন।
স্কালোনি বলেন, ‘রোববার দারুণ একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’
অনুষ্ঠান শেষ করে যাওয়ার আগে মেসি বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে ফাইনালে কী অপেক্ষা করছে, তা তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের পর কোনো দল টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এবার সেই বিরল ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে।
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড় ও কোচিং দল প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করছে, যাতে দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পারি। মেসিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সর্বস্ব দিয়ে লড়ব। বিশ্বকাপ আবারও দেশে ফিরিয়ে এনে মানুষের সঙ্গে উদ্যাপন করতে চাই।’
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে নিউইয়র্কের এই বিশেষ অনুষ্ঠান তাই শুধু একটি প্রচারণামূলক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মেসিকে ঘিরে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য মুহূর্ত হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকল।
মন্তব্য করুন