
১৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ২০১০ সালে জোহানেসবার্গে যে কীর্তি গড়েছিলেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, ২০২৬ সালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেই অমরত্ব পেলেন ফেরান তোরেস। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়ে, অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় ও একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিল স্পেন। এই জয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরল ‘লা রোজা’রা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের গোলশূন্য ড্রয়ের পর অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো এই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও বারুদঠাসা ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রুদ্ধশ্বাস প্রথমার্ধ: ইয়ামালের আক্রমণ ও দিবুর প্রাচীর
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই স্প্যানিশ আর্মাডারা বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চেনা ছন্দে আক্রমণ শানাতে থাকে। প্রথমার্ধের শুরুতেই ম্যাচের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও গোলের কাছাকাছি সুযোগটি পেয়েছিল স্পেন। তাদের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে বক্সে ঢুকে দারুণ এক শট নেন। তবে আর্জেন্টিনার পোস্টের নিচে যথারীতি প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ। অবিশ্বাস্য এক সেভ করে আর্জেন্টিনাকে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন এই বিশ্বস্ত বাজপাখি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি প্রথমার্ধে তুলনামূলক শান্ত ও চেনা ছন্দের বাইরে ছিলেন। স্পেনের মিডফিল্ড ও ডিফেন্স মেসিকে কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিল। অতিরিক্ত ৪ মিনিটসহ প্রথমার্ধের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষ পর্যন্ত ০-০ গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়।
ম্যাচের গোল বিবরণী: অতিরিক্ত সময়ে তোরেসের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই ডেডলক ভাঙতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধও ছিল অমীমাংসিত। তবে ১০৯ মিনিটে বাঁধানো এক আক্রমণ থেকে বক্সের ঠিক বাইরে বল পান বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সামান্য অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে কোণাকুণি এক বুলেট গতির শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন তিনি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্প্যানিশ সমর্থকদের বাঁধভাঙা উল্লাসে ভাসিয়ে স্পেনের বিশ্বজয় নিশ্চিত করে এই একটিমাত্র গোল।
স্পেনের বাতিল হওয়া দুই গোল
ম্যাচটিতে স্পেনের আক্রমণভাগের সামনে বারবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে। ম্যাচে স্পেনের করা আরও দুটি দুর্দান্ত গোল অফসাইড এবং ফাউলের কারণে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সহায়তায় বাতিল করেন রেফারি। এই দুটি গোল বাতিল না হলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত, যা আর্জেন্টিনার জন্য ছিল এক বিরাট লাইফলাইন।
মেগা ফাইনালের ৩১ ফাউলের কৌশলগত ও গাণিতিক ব্যবচ্ছেদ নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবলীয় নান্দনিকতার চেয়েও বেশি রূপ নিয়েছিল এক স্নায়ুক্ষয়ী মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক যুদ্ধে। পুরো ১২০ মিনিটে দুই দল মিলিয়ে মোট ৩১টি ফাউল করেছে, যার মধ্যে আর্জেন্টিনা ১৭টি এবং স্পেন ১৪টি ফাউল করে। ম্যাচের সময় ও কৌশল অনুযায়ী এই ফাউলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।
প্রথমার্ধ (১-৪৫ মিনিট): মাঝমাঠের দখল ও টিকিটাকা ভাঙার কৌশল (মোট ফাউল: ১১টি) ম্যাচের শুরুর ভাগেই স্পেনের নিখুঁত ছোট ছোট পাসের 'টিকিটাকা' ছন্দ নষ্ট করার জন্য ফাউলের রণকৌশল বেছে নেয় আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা (৭টি ফাউল): স্পেনের রদ্রি ও পেদ্রি যখনই মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ শানাতে চেয়েছেন, তখনই রদ্রিগো ডি পল এবং এনজো ফার্নান্দেজ মাঝবৃত্তেই কড়া কিন্তু ছোট ছোট 'ট্যাকটিক্যাল ফাউল' করে স্পেনের আক্রমণের গতি ধীর করে দেন।
স্পেন (৪টি ফাউল): প্রথমার্ধে লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখতে ডিফেন্ডার রবিন লে নরম্যান্ড ও ফাবিয়ান রুইজ মেসিকে পেছনে থেকে টেনে ধরে এবং স্লাইডিং ট্যাকেলে মোট ৪ বার ফাউল করেন, যার ফলে মেসি প্রথমার্ধে চেনা ছন্দে ফিরতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধ (৪৬-৯০ মিনিট): ক্লান্তি, কার্ডের ছড়াছড়ি ও ডাগআউটের উত্তেজনা (মোট ফাউল: ১২টি)
ম্যাচের বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুই দলের খেলোয়াড়দের ক্লান্তি বাড়ে এবং ফাইনাল থার্ডে গোল পাওয়ার তীব্রতায় ফাউলের পরিমাণ ও চড়া ভাব বৃদ্ধি পায়।
আর্জেন্টিনা (৬টি ফাউল): স্পেনের উইঙ্গার লামিন ইয়ামালের ক্ষিপ্র গতিকে ডি-বক্সের বাইরে রুখতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডাররা বেশ কয়েকবার সাইড-ট্যাকলের আশ্রয় নেন। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে দানি কারভাহালকে পাল্টা ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন রদ্রিগো ডি পল। এছাড়া রেফারির একটি ফাউলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখানোয় ডাগআউটে আর্জেন্টিনার হেড কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও রেফারি হলুদ কার্ড দেখান।
স্পেন (৬টি ফাউল): স্পেনের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার দানি কারভাহাল মাঝমাঠে বল কাটার উদ্দেশ্যে রদ্রিগো ডি পলকে একটি বিপজ্জনক স্লাইডিং ট্যাকল করে ফাউল করেন এবং সরাসরি হলুদ কার্ড পান। স্পেনের করা এই অর্ধেকের বেশি ফাউলই ছিল আর্জেন্টিনার কাউন্টার-অ্যাটাক থামানোর উদ্দেশ্যে।
অতিরিক্ত সময় (৯১-১২০ মিনিট): তোরেসের গোল, চরম নাটকীয়তা ও লাল কার্ড (মোট ফাউল: ৮টি)
ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় ও শারীরিক ফুটবল দেখা গেছে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। ১০৯ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন এগিয়ে যাওয়ার পর মাঠের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
আর্জেন্টিনা (৪টি ফাউল): গোল খেয়ে সমতায় ফিরতে মরিয়া আর্জেন্টিনা স্পেনের পায়ে বল গেলেই অল-আউট প্রেসিং শুরু করে। ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ফাউলটি ঘটে ১১২ মিনিটে। স্পেন যখন বল নিয়ে বিপজ্জনক কাউন্টার অ্যাটাকে উঠছিল, তখন আর্জেন্টিনার একজন গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার পেছন থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও হিংস্রভাবে রেসিং ট্যাকল (Professional Foul) করেন। রেফারি কোনো দ্বিধা না করে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন।
স্পেন (৪টি ফাউল): ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে আর্জেন্টিনা যখন ১০ জনের দল নিয়েও গোল শোধ করতে মরিয়া, তখন স্পেনের রদ্রি ও বদলি নামা ডিফেন্ডাররা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের বক্সের বেশ বাইরে ট্যাকটিক্যাল ফাউল করে সময় নষ্ট করার ও আর্জেন্টিনার ছন্দ ভাঙার কৌশল নেন।
খেলোয়াড় ভিত্তিক ফাউলের খতিয়ান: আর্জেন্টিনা (১৭টি): রদ্রিগো ডি পল (৪টি), লিসান্দ্রো মার্টিনেজ (৩টি), এনজো ফার্নান্দেজ (৩টি), নিকোলাস ওটামেন্ডি (৩টি), গঞ্জালো মনতিয়েল (২টি), অন্যান্য (২টি)। স্পেন (১৪টি): দানি কারভাহাল (৩টি), রদ্রি (৩টি), ফাবিয়ান রুইজ (৩টি), রবিন লে নরম্যান্ড (২টি), অন্যান্য (৩টি)।
৩১টি ফাউলের এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালটি কতটা বারুদঠাসা ছিল। আর্জেন্টিনা ১৭টি ফাউল করে আগ্রাসী ডিফেন্সের পরিচয় দিলেও শেষ মুহূর্তের লাল কার্ড এবং তোরেসের ১০৯ মিনিটের জাদুকরী গোল ম্যাচটি স্পেনের পক্ষে (১-০) লিখে দেয়।
কোচের হলুদ কার্ড: ডাগআউটে অতিরিক্ত উত্তেজনা ও রেফারির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করায় আর্জেন্টিনার হেড কোচ লিওনেল স্কালোনিকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।
হলুদ কার্ডের ছড়াছড়ি: দু'দলের একাধিক খেলোয়াড়কে রেফারি বুকড করেন। আর্জেন্টিনার রদ্রিগো ডি পল, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং স্পেনের রদ্রি, দানি কারভাহালসহ একাধিক তারকা খেলোয়াড় বিপজ্জনক ট্যাক্টিকাল ফাউলের জন্য হলুদ কার্ডের শাস্তি পান।
আর্জেন্টিনার লাল কার্ড: ১০৯ মিনিটে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর ১১২ মিনিটে স্পেনের এক খেলোয়াড় বল নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার সময় আর্জেন্টিনার একজন গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার পেছন থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও হিংস্রভাবে রেসিং ট্যাকল করেন। রেফারি কোনো দ্বিধা না করে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়টিকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনার জন্য এরপর ম্যাচে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার বিশ্লেষণ
ফেরান তোরেস ও স্প্যানিশ মিডফিল্ডের কৃতিত্ব: বদলি নেমে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া তোরেস নিশ্চিতভাবেই ম্যাচের নায়ক। পাশাপাশি রদ্রি ও পেদ্রির মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের এই অবিস্মরণীয় জয়ের মূল ভিত্তি ছিল।
আর্জেন্টাইন ডিফেন্স ও ‘দিবু’র লড়াই: লাউতারো মার্টিনেজকে ছাড়াই মাঠে নামা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ এদিন পুরোপুরি ধারহীন ছিল। তবে ফরোয়ার্ড লাইনের এই অনুপস্থিতির মাঝেও দুটি গোল বাতিল হওয়া এবং স্পেনের মুহুর্মুহু আক্রমণ সত্ত্বেও ১০৮ মিনিট পর্যন্ত জাল অক্ষত রাখা আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের বড় কৃতিত্ব।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ব্যর্থতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গ: লাউতারো মার্টিনেজের অনুপস্থিতিতে লিওনেল মেসির সাথে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ তাদের চেনা ছন্দ দেখাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফাইনাল থার্ডে এসে খেই হারিয়ে ফেলা এবং শেষ মুহূর্তে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া আর্জেন্টিনার ট্রফি হারানোর প্রধান কারণ।
মন্তব্য করুন