
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করেছে যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান এবং লেবানন নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার দিকে ঝুঁকতে পারেন। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজ সমর্থকদের কাছে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে তিনি হিজবুল্লাহবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক মিত্রদের বোঝাতে চাইছেন যে তিনি লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করবেন না এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই সপ্তাহে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে এমন পদক্ষেপ সম্প্রতি হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত লঙ্ঘন করতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন, এমন কোনো সামরিক হামলা চালানো উচিত নয় যা ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি বা শান্তি উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তবে ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
শুক্রবার হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালায়। এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনাও স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের। তিনিও তার নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, শরতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে তিনি নিরাপত্তা ও যুদ্ধের প্রশ্নে কতটা কঠোর অবস্থান দেখাতে পারেন তার ওপর।
বিশ্লেষক হ্যারিসন ম্যানের মতে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে শক্তিশালী নেতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দিতে নেতানিয়াহু লেবানন ও হিজবুল্লাহ ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চাইছেন।
লেবানন প্রশ্নে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কিছু মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ইসরায়েলি নেতাকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রতিটি ঘটনার জবাবে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহু যদি লেবাননে সামরিক অভিযান আরও বাড়িয়ে দেন, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভিত্তিই দুর্বল হবে না, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর হামলা থেকে ইসরায়েলি নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে সমন্বিত হামলার পর থেকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ইসরায়েলের জনসমর্থন বেড়েছে। উত্তর ইসরায়েলের হাজারো বাস্তুচ্যুত নাগরিকও সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল যদি দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গড়ে ওঠা নাজুক সমঝোতা ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘাত আবারও শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির লেবাননের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার মনে করেন, অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের ওপর সীমিত চাপ প্রয়োগ করলেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ট্রাম্প আপত্তি জানালেও নেতানিয়াহু পাল্টা সামরিক জবাব দিতে পারেন।
মন্তব্য করুন