
মুদ্রার দরপতন ও ভিসা জটিলতার কারণে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সি কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রগতি প্রিয়া আগামী সেপ্টেম্বরে রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে যাচ্ছেন। বহু বছরের পরিকল্পনার পর এই সিদ্ধান্ত নিলেও এখন রুপির দরপতনের কারণে তার পড়াশোনার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় তিনি মানসিক চাপের মধ্যে আছেন।
প্রিয়া বলেন, “দুশ্চিন্তায় আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এমন কোনো স্টুডেন্ট লোনের বোঝা নিতে চাই না, যা আমি কখনোই শোধ করতে পারব না।”
তার এই উদ্বেগ একক কোনো ঘটনা নয়; বরং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ভারতীয় শিক্ষার্থীর বাস্তবতার প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১২ লাখের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রধান উৎস হিসেবে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে রুপির অবমূল্যায়ন, ভিসার কঠোর শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চাকরির অনিশ্চিত সুযোগের কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখন নতুন করে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নেওয়া বড় অংকের ঋণ এখন অনেকের জন্য ভারী বোঝা হয়ে উঠছে।
প্রগতি প্রিয়া জানান, পরিবারের সমর্থনের কারণে তিনি ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এই ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য নেই, যার প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিতেও। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, আগামী সেপ্টেম্বর সেশনে ভর্তির হার কমতে শুরু করেছে।
প্রতিবছর ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানো প্রতিষ্ঠান এডওয়াইজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সুশীল সুখওয়ানি বলেন, “বাজার ধীর হয়ে আসছে। গত দুই বছরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। সামনে আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।”
ভিসা জটিলতা ও আর্থিক চাপ
ভিসা নীতির কঠোরতা এবং অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যুক্তরাজ্যের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি কমেছে, একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রেও।
রুপির দরপতনের কারণে ইতিমধ্যে বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির মান ১০ শতাংশেরও বেশি কমেছে বলে জানানো হয়েছে।
২০১৯ সাল থেকে প্রধান গন্তব্য দেশগুলোর মুদ্রার বিপরীতে রুপির মান ৩৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চাকরির বাজার ও বিকল্প গন্তব্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরির সুযোগ পাওয়ার স্বপ্ন অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অনেকে বাধ্য হয়ে গিগ বা চুক্তিভিত্তিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘বিগ ফোর’ গন্তব্যের বাইরে নতুন গন্তব্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও ইতালির মতো দেশগুলো এখন শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক কম খরচ ও ভালো সুযোগের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ইউনিভার্সিটি লিভিং-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা মায়াঙ্ক মহেশ্বরী বলেন, এসব দেশে টিউশন ফি কম, কাজের সুযোগ বেশি এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে।
প্রগতি প্রিয়া জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ইতালি বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ব্যয়। সেখানে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং সময়ও কম লাগে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রবণতা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ভারত এখনো এসব দেশের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম বৃহৎ উৎস।
বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রার দরপতন, ভিসা জটিলতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মিলিয়ে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, যা শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন