
লাখো মানুষকে নিঃস্ব করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া কাজলের মৃত্যু। শেষ হলো আলোচিত এক অধ্যায়ের। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল হোতা, কুখ্যাত ‘হুন্ডি কাজল’ নামে পরিচিত ফারুক আহমেদ কাজল আর নেই।
বুধবার (২৪ জুন) রাত ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার চাকদহ থানা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ভারতের স্থানীয় একটি কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোটচাঁদপুর শহরের বাসিন্দা ও তার ছোট ভাই কবি চঞ্চল শাহরিয়ার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফারুক আহমেদ কাজল। তবে, ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল এক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।
তার পরিচালিত ওই হুন্ডি ব্যবসায় ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার লাখো মানুষ বিনিয়োগ করেন। কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের জমিজমা ও সঞ্চয় বিক্রি করে অর্থ লগ্নি করলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের অর্থ নিয়ে হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান কাজল। তার এই অর্থ কেলেঙ্কারির কারণে হাজারো পরিবার পথে বসে যায়। আর্থিক ক্ষতির শোক সইতে না পেরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেন। লগ্নীকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কোটচাঁদপুর সফর করে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কাজলের বিরুদ্ধে কোটচাঁদপুরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয়। এক পর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হলেও আদালত থেকে জামিন লাভের পর গোপনে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বলে জানা যায়।
কাজলের ছোট ভাই চঞ্চল শাহরিয়ার বলেন, আমাদের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন—এ তথ্য সত্য।
এদিকে, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার প্রথম স্ত্রী শামিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে কোটচাঁদপুরের সলেমান গ্রামে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনসারুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর খবর জেনেছি। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে তার নামে পাঁচটি গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল।
হুন্ডি কাজলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসে আলোচিত এক আর্থিক কেলেঙ্কারির অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, সর্বস্ব হারানো হাজারো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও বেদনার স্মৃতি আজও মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন