
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির চিত্র দেখে চোখ চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৮ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে নয় জন শিক্ষক ও দুই জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের বেতনের পেছনে প্রতি মাসে সরকারি রাজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হচ্ছে আড়াই লক্ষাধিক টাকা। অথচ, বিপুল অংকের এই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিপরীতে বিদ্যালয়ে নেই কাঙ্খিত শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫ মিনিটে সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে মিলেছে এক বিস্ময়কর ও হতাশাজনক চিত্র। এদিন ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি মিলিয়ে পুরো বিদ্যালয়ে মাত্র আট জন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিন জন ছাত্র, সপ্তম শ্রেণিতে দুই জন ছাত্র ও এক জন ছাত্রী এবং অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র দুই জন ছাত্রী উপস্থিত ছিল। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে শিক্ষকরা যখন পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখনও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ওই আট জনই ছিল।
পরদিন ২৪ জুন (বুধবার) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের সময় দ্বিতীয় দফায় অনুসন্ধানে গিয়েও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। এদিন ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি মিলিয়ে পুরো বিদ্যালয়ে মাত্র ১৩ জন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে চার জন ছাত্র, তিন জন ছাত্রী, সপ্তম শ্রেণিতে দুই জন ছাত্র ও দুই জন ছাত্রী এবং অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র দুই জন ছাত্রী উপস্থিত ছিল। অথচ প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার খাতার তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৮ জন। যার মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১৪ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ১৩ জন এবং অষ্টম শ্রেণিতে ১১ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। কাগজের হিসাবের সাথে বাস্তবের এই উপস্থিতির বিশাল ফারাক জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যার থেকেও যখন শিক্ষার্থী উপস্থিতির সংখ্যা কোনো দিন কম, কোনো দিন কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে; সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি দেয়ালঘেরা টিনশেড ঘরের ভেতরেই চলছে অফিস ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম। এক রুমের ছোট একটি ভবন রয়েছে। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠদান চলে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো বসার জায়গাও নেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে তিন জন শিক্ষক ও তিন জন কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে।
টানা দুই দিনের অনুসন্ধানে উঠে আসা এমন নাজুক চিত্র নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, যেখানে অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা, সেখানে প্রতি বছর সরকারের লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা স্পষ্টতই রাজস্বের অপচয়। তারা অতি দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রওশন আরা পারভীন অবশ্য দাবি করেন, “বিধি মোতাবেকই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।” তবে তিনি শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হোসনে মোবারক বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, “আপনার মাধ্যমেই বিষয়টি অবগত হলাম। বিদ্যালয়টির কেন এই নাজুক অবস্থা, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
মন্তব্য করুন