
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম এক শতাংশের বেশি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবকে ছাপিয়ে এখন বিনিয়োগকারীদের নজর যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য সুদের হার বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দিকে। এর ফলে স্বর্ণের বাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে এবং অক্টোবর ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক দরপতনের পথে রয়েছে মূল্যবান এই ধাতু।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১.৫ শতাংশ কমে ৩,৯৫৬.৯২ ডলারে নেমে এসেছে।
একই সময়ে আগস্ট ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার ১.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৩,৯৬৯.৩০ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
চলতি মাসে এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ১২.৭ শতাংশ কমেছে। এটি টানা চতুর্থ মাসিক পতন। এছাড়া ২০২৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বুলিয়ন বাজারে ত্রৈমাসিক দরপতন দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৩ সালের জুন ত্রৈমাসিকের পর এটিই সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক পতন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সেই চাপ সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শক্তিশালী হয়েছে।
মারেক্সের বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেয়ার বলেন, বর্তমানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদের হারের প্রত্যাশা এবং শক্তিশালী ডলার-এই তিনটি বিষয় স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পক্ষে থাকা অন্যান্য ইতিবাচক কারণকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
যদিও স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, তবে উচ্চ সুদের হারের পরিবেশে এই মূল্যবান ধাতুর আকর্ষণ কমে যায়।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেডাররা এখন চলতি বছরে ফেডারেল রিজার্ভের তিন দফা সুদের হার বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন। এছাড়া সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বর্তমানে প্রায় ৬৪ শতাংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফেডের পরবর্তী নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে বিনিয়োগকারীরা এখন এ সপ্তাহে প্রকাশিতব্য জুন মাসের এডিপি কর্মসংস্থান এবং অকৃষি কর্মসংস্থানের তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে মার্কিন ডলার টানা দ্বিতীয় মাসের মতো লাভের পথে রয়েছে। এতে অন্যান্য মুদ্রার ব্যবহারকারীদের জন্য ডলারভিত্তিক মূল্যবান ধাতু কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, এ সপ্তাহে দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার ফলাফলের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা।
যদিও ইরান জানিয়েছে, এমন কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি। একই সময়ে তেলের দাম ২০২০ সালের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক পতনের পথে রয়েছে।
এডওয়ার্ড মেয়ারের ধারণা, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৪০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।
এদিকে, বিশ্ববাজারে দাম কমায় দেশের বাজারেও কমতে পারে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে এর প্রভাব পড়ে দেশের বাজারেও। তাই যে কোনো সময় দেশের বাজারেও দাম কমানো হতে পারে।
এর আগে সবশেষ গত ২৯ জুন সকালে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সেদিন ভরিতে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৩২ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
বিশ্বাবাজারে স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৭ দশমিক ১৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্ল্যাটিনামের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৫৫৭ দশমিক ২১ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ২০৮ দশমিক ১৭ ডলারে নেমেছে। মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এই তিনটি ধাতুই লোকসানের পথে রয়েছে।
মন্তব্য করুন