
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে নিজেদের প্রাপ্য পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা প্রকাশের পর পাকিস্তান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইসলামাবাদ দাবি করেছে, তাদের ন্যায্য পানির প্রবাহে হস্তক্ষেপ করা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদমন্ত্রী সি আর পাতিল সম্প্রতি জানান, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভারতের অংশের পানি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই ঘোষণার পরই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া আসে।
ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী দেশ সিন্ধু নদের পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তানের দিকে পানির প্রবাহ সীমিত করতে চায়।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানির প্রবাহে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।
মুসাদিক মালিক সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের পানির অধিকার ক্ষুণ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টার জবাব দেওয়া হবে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী দাবি করেন, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী উজানের দেশ একতরফাভাবে ভাটির দেশের পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে পারে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এই নীতিকে আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিষয়টি উত্থাপন করে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলোর পানির অধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে আনা হবে।
একই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেন যে সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তিটি আইনগতভাবে এখনও বহাল রয়েছে এবং কোনো দেশ এককভাবে এটি বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে সিন্ধু নদের পানি পাকিস্তানের জন্য জীবনরেখা এবং এটি তাদের জন্য একটি লাল রেখা বা ‘রেড লাইন’।
ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট। গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে সংঘটিত আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলায় ২৫ জন পর্যটকসহ মোট ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি সিন্ধু পানি চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
ভারতের সরকার জানিয়েছে, পাকিস্তান তার ভূখণ্ডে সক্রিয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের দৃশ্যমান প্রমাণ না দেওয়া পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
সিন্ধু নদ ব্যবস্থা দুই দেশের কৃষি, পানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে এই চুক্তি ঘিরে চলমান উত্তেজনা শুধু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এই বিরোধের সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য করুন