
বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে গত কয়েক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশ্বমানের একাডেমি নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক তারকা ফুটবলারদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ সৌদি আরব ও কাতার। তবে চলমান বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করে দিল, অর্থ ও অবকাঠামো থাকলেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে দুই দেশকেই। বিশেষ করে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরবের বিদায় সবচেয়ে বড় হতাশা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রুপ ‘এইচ’-এ সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রতিপক্ষ ছিল মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপ ভার্দে। তুলনামূলকভাবে ছোট এই আফ্রিকান দেশ তিন ম্যাচে তিনটি ড্র করে গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়।
অন্যদিকে সৌদি আরব মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নেয়। হতাশাজনক এই পারফরম্যান্সের সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন সৌদি আরব ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইয়াসের আল-মিশহাল।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও করিম বেনজেমার মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের সৌদি প্রো লিগে নিয়ে এসে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সৌদি আরব। ক্লাব ফুটবলে বিপুল বিনিয়োগ দেশটির ফুটবল বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেও জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে সেই প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সৌদি আরবের কোচ জর্জিয়াস ডোনিস বলেন, আমরা এমন একটি দলের বিপক্ষে খেলেছি, যারা অনেকটাই আমাদের সমপর্যায়ের। কিন্তু আমাদের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল না। এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে সৌদি আরবকে কেবল অবকাঠামো নয়, দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় দল গঠনের দিকেও আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপের স্বাগতিক কাতারও এবার গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। তিন ম্যাচ শেষে বিদায় নিতে হলেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জনের নজির গড়ে দলটি।
স্পেন ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ হুলেন লোপেতেগিকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়াও প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে কাতারের বিনিয়োগ কতটা ব্যাপক।
মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ, যার মধ্যে নাগরিক প্রায় ৩ লাখ। তবু নিজেদের ফুটবল কাঠামো থেকে এমন এক প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরি করেছে, যারা এশিয়ান পরাশক্তি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দলগুলোকেও পেছনে ফেলছে।
২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আটটি অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের চার বছরের মাথায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হওয়া কাতারের জন্য বড় হতাশাই। সৌদি আরবের মতো কাতার বড় তারকাদের পেছনে উন্মাদের মতো না ছুটলেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের একাডেমি ও ফুটবলার তৈরি করেছিল, যার ফলে তারা টানা দুবার এশিয়ান কাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে; কিন্তু সেই দাপট বিশ্বকাপের মঞ্চে কাজে আসেনি।
লোপেতেগি বলেন, ‘অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আমরা জানি, আমরা কারা। ছোট একটি দেশ হলেও আমাদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ও বিনিয়োগ অনেক বড়। প্রতিদিনই উন্নতি করতে হবে এবং আমরা সেই পথেই এগোচ্ছি। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী।’
১৯৭৮ সাল থেকে সাতটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইরান এবার তিনটি ড্র করেও সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলের তালিকায় অল্পের জন্য জায়গা হারায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে প্রস্তুতির শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল দলটি।
একইভাবে ইরাকও চার দশকের ব্যবধানে দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনো গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারেনি।
চলমান বিশ্বকাপের ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, কেবল বিপুল অর্থ বিনিয়োগ, বিশ্বমানের স্টেডিয়াম নির্মাণ কিংবা আন্তর্জাতিক তারকা ফুটবলারদের ঘরোয়া লিগে আনা দিয়ে জাতীয় দলের সাফল্য নিশ্চিত করা যায় না। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী খেলোয়াড় উন্নয়ন ব্যবস্থা, ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং কার্যকর ফুটবল সংস্কৃতি।
মন্তব্য করুন