
টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি। এরই মধ্যে তার দল জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনালে। আর মাত্র একটি ম্যাচ জিতলেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলবে মেসির আর্জেন্টিনা।
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে এটিই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। সম্ভাব্য এই শেষ অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখতে তার জন্য বিশেষ সংস্করণের একটি ফুটবল বুট উন্মোচন করেছে স্পোর্টস ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস। নতুন এই বুট পরেই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে চলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এখন পর্যন্ত ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছেন তিনি।
‘এফ ফিফটি আলতিমো ট্যাঙ্গো’—মেসির শেষ নৃত্যের প্রতীক অ্যাডিডাস বিশেষ এই বুটের নাম দিয়েছে স্প্যানিশ ভাষায় ‘এফ ফিফটি আলতিমো ট্যাঙ্গো’। বাংলায় যার অর্থ ‘শেষ ট্যাঙ্গো’ বা ‘শেষ নৃত্য’। নামের মধ্যেই মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের আবেগ ও বিদায়ের ইঙ্গিত তুলে ধরেছে ব্র্যান্ডটি।
মেসির প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতি থেকে তৈরি বুট ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মেসি। সেই সময় তার পায়ে ছিল অ্যাডিডাস এফ ফিফটি পয়েন্ট সিক্স টিউনিট। প্রায় দুই দশক পর ‘এফ ফিফটি আলতিমো ট্যাঙ্গো’ বুট তৈরির সময় সেই পুরোনো বুটের নকশা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছে অ্যাডিডাস।
নতুন বুটে তাই ২০০৬ সালের সেই বুটের ডিজাইনের ছাপ স্পষ্ট। তবে নস্টালজিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিও। বুটটির অন্যতম আকর্ষণ হলো জুতার ফিতার ওপর থাকা বিশেষ লেস-কভার। এর মাঝখানে সোনালি রঙে রয়েছে লিওনেল মেসির অফিসিয়াল সিগনেচার লোগো।
আর্জেন্টিনার রঙে সাজানো সাদার ওপর আকাশি নীল ও সোনালির সমন্বয়ে তৈরি বুটটি। অ্যাডিডাসের বিখ্যাত তিনটি স্ট্রাইপও এখানে এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। শার্প গ্রাফিক্সে সাজানো স্ট্রাইপগুলো বুটটিকে দিয়েছে আরও স্বতন্ত্র রূপ।
নস্টালজিয়ার আবরণে মোড়া হলেও প্রযুক্তির দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ আধুনিক একটি পারফরম্যান্স বুট। এর ওপরের অংশে ব্যবহার করা হয়েছে হ্যালোকেজ প্লাস টিপিইউ ফ্রেম আর হাইব্রিড টাচ প্লাস প্রযুক্তি। হ্যালোকেজ প্লাস টিপিইউ ফ্রেম পা স্থির রাখতে ও সাপোর্ট দিতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে হাইব্রিড টাচ প্লাস প্রযুক্তি বল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে স্পিড, গ্রিপ ও ট্র্যাকশনের কথা মাথায় রেখে জুতার আউটসোল করা হয়েছে। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই দুই দশক ধরে বিশ্বকাপে খেলেছেন। মেসি সেই বিরল তারকাদের একজন, আর এই বুট তার শুরু থেকে শেষের গল্পের সঙ্গী।
কেন স্পেশাল এই বুট ফুটবলের আদি যুগে বুট মানেই ছিল কেবলই জমাট কালো রঙ। কালের বিবর্তনে সেখানে লাল, হলুদ, নীল বা সবুজের ছোঁয়া লাগলেও এবারের আসরের গল্পটা একদম ভিন্ন। নাইকি, এডিডাস কিংবা পুমার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এবার হাত মিলিয়েছে এক অদ্ভুত সমীকরণে। ২০২৪ সালেই ফ্যাশন দুনিয়ার ট্রেন্ড বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউজিএসএন পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালের বাজার শাসন করবে গোলাপি আর বেগুনির মিশ্রণে তৈরি ‘ইলেকট্রিক ফুশিয়া’ রঙটি। ব্র্যান্ডগুলো সেই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে।
এটি শুধু মাঠের ফ্যাশন নয়, বরং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিখুঁত এক বাণিজ্যিক চাল। শুধু বুটেই ক্ষান্ত থাকেনি তারা, নামী দামী ক্লাবের জার্সির স্ট্রাইপেও এখন এই রঙের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এর আরেকটি বড় কারণ হলো দৃশ্যমানতা। সবুজ মাঠের বুক চিরে এই উজ্জ্বল রঙটি ফ্লাডলাইটের আলোয় কিংবা টেলিভিশন ও মোবাইলের পর্দায় এতটাই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে, দর্শকদের চোখ এড়ানো অসম্ভব। আর এই নিখুঁত ভিজ্যুয়াল ট্রিকস ব্র্যান্ডগুলোর প্রচারণাকে নিয়ে গেছে এক অন্য মাত্রায়।
এই বুটের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর নিখুঁত বুননে। এডিডাস এই জুতোটিতে মেসির পুরো ক্যারিয়ারের একটা জীবন্ত কোলাজ ফুটিয়ে তুলেছে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে মেসির পরা প্রথম সাদা-আকাশী বুট, ২০১০ সালের কালো জুতো, কিংবা ২০১৪, ২০১৮ এবং সবশেষ ২০২২ সালে কাতার জয়ের সেই সোনালী বুট—মেসির বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপের প্রতিটি বুটের রঙের কোনো না কোনো ক্ষুদ্র অংশ, টেক্সচার কিংবা সুতোর সেলাই লুকিয়ে আছে এই নতুন জুতোর খাঁজে খাঁজে।
মাঠের বাকি ফুটবলাররা যখন কেবলই একটি নতুন ফ্যাশন বা ব্র্যান্ডের ট্রেন্ডকে পায়ে জড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন, ঠিক তখন লিওনেল মেসি মাঠে নামছেন নিজের পুরো ফুটবল জীবনের ইতিহাস ও আবেগ সাথে নিয়ে। আর ঠিক এই কারণেই তিনি বাকি সবার চেয়ে আলাদা, বাকি সবার চেয়ে অনন্য।
মেসির বিশেষ বুটের দাম কত? অ্যাডিডাসের এই বিশেষ বুটের এলিট ভার্সনের দাম প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম আনুমানিক ৩৪ হাজার টাকার কাছাকাছি।
সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে মেসির পায়ের এই বিশেষ বুট তাই শুধু মাঠে তার পারফরম্যান্সের সঙ্গী নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের দীর্ঘ বিশ্বকাপ যাত্রার স্মারক হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে।
মন্তব্য করুন