
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার হতাশা ভুলে রোমাঞ্চকর এক গোল উৎসবে মেতে উঠল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। বুকায়ো সাকার চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক এবং জুড বেলিংহ্যামের শেষ মুহূর্তের ম্যাজিকে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে টমাস টুুুুখেলের ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে একমাত্র শিরোপা জয়ের পর বিশ্বকাপে এটিই ইংলিশদের সেরা সাফল্য। এর আগে ১৯৯০ ও ২০১৮ আসরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরেছিল তারা।
শনিবার মায়ামি গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের নতুন রেকর্ড গড়েছে। পেছনে পড়ে গেছে ১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফ্রান্সের ৬-৩ গোলে জেতার স্মৃতি।
চাপহীন এই ম্যাচে দুই দলই তাদের শুরুর একাদশে ৭টি করে পরিবর্তন এনে মাঠে নামে। ম্যাচের শুরু থেকেই ফরাসি রক্ষণের ওপর চড়াও হয় ইংল্যান্ডের নতুন কম্বিনেশন। ম্যাচের মাত্র ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে (তৃতীয় মিনিট) মাঝমাঠে ফ্রান্সের ভুল পাস থেকে বল পেয়ে ২৫ গজ দূর থেকে জোরাল শটে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেন ডেক্লান রাইস। এটি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় দ্রুততম গোল (রেকর্ডটি ব্রায়ান রবসনের, ১৯৮২ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ২৮ সেকেন্ডে)।
১৮তম মিনিটে রাইসের কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে ব্যবধান ২-০ করেন সেন্টার-ব্যাক এজরি কন্সা। ম্যাচের ৩৭তম মিনিটে গতিময় প্রতি-আক্রমণ থেকে মার্কাস রাশফোর্ডের কাটব্যাকে প্রথম গোল করেন বুকায়ো সাকা। বিরতির ঠিক আগে (৪৪তম মিনিটে) এবেরেচি এজের পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোলটি করেন এই আর্সেনাল ফরোয়ার্ড।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম প্রথমার্ধে ৪ গোল হজম করে ব্যাকফুটে চলে যায় ফ্রান্স। আর সব মিলিয়ে ৫৮ বছর পর (সবশেষ ১৯৬৮ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে) প্রথমার্ধে ৪ গোল খাওয়ার লজ্জায় পড়ে ফরাসিরা।
৪-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দিদিয়ে দেশোঁর শিষ্যরা। ৯ মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল শোধ করে ম্যাচে প্রাণ ফেরায় তারা। মাইকেল ওলিসের পাস থেকে আসরে নিজের ৯ম গোলটি করেন কিলিয়ান এমবাপে। এমবাপের পাস থেকে ব্যবধান ৪-২ করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। ওলিসের সাথে দারুণ ওয়ান-টু-ওয়ান পাসিংয়ে ডি-বক্সে ঢুকে প্লেসিং শটে ম্যাচ জমিয়ে তোলেন এমবাপে (৪-৩)।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির সর্বোচ্চ ২১ গোলের রেকর্ড ভেঙে নিজের মোট গোলসংখ্যা ২২-এ নিয়ে গেলেন এমবাপে। একই সাথে ১০ গোল নিয়ে চলতি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতাও এখন তিনি (৮ গোল নিয়ে দুইয়ে মেসি)। অন্যদিকে, এই গোলে অ্যাসিস্ট করে কিংবদন্তি পেলের ১৯৭০ সালের এক আসরে ৬টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড ভেঙে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন ফ্রান্সের মাইকেল ওলিস (৭টি অ্যাসিস্ট)।
ম্যাচ যখন ৩-৪ প্রায় সমতায়, তখন ৮৭তম মিনিটে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। সফল স্পট কিকে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাকা (জাতীয় দলের হয়ে ১৭তম এবং বিশ্বকাপে মোট ৬ষ্ঠ গোল)। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-৩।
নাটকের তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে (৯৬ মিনিট) উসমান দেম্বেলে গোল করলে ব্যবধান আবারও ৫-৪ হয়ে যায়। তবে ফরাসিদের সমতায় ফেরার শেষ আশাটুকু ভেঙে দেন বদলি নামা জুড বেলিংহ্যাম। নিজেদের সীমানা থেকে একক নৈপুণ্যে বল টেনে নিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে জোরাল শটে ফ্রান্সের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন এই রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার। চলতি আসরে এটি বেলিংহ্যামের সপ্তম গোল।
৬-৪ গোলের এই রোমাঞ্চকর হারের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটল ফ্রান্সের ডাগআউটে দিদিয়ে দেশোঁর এক যুগেরও বেশি সময়ের গৌরবময় অধ্যায়ের। বিদায়ী কোচকে জয় উপহার দিতে না পারার কিছুটা আফসোস থাকলেও, ম্যাচ শেষে দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যেই এক অনন্য ফুটবলীয় লড়াইয়ের তৃপ্তি দেখা গেছে।
মন্তব্য করুন