
প্রতিবছর ঈদুল আযহাকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম রাজারহাটে কোরবানির লক্ষাধিক চামড়ার আমদানি নয়। এবছর এই চামড়ার আমদানি এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। প্রতিবছরই চামড়ার দরপতনসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চামড়া বাজারের এই পরিস্থিতিকে শিল্পের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য সরকারকে বিকল্প ভাবনারও তাগিদ দিয়েছেন। ঈদ পরবর্তী একমাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম রাজারহাট ঘুরে এবং এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এই চিত্র উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশের চামড়া শিল্প এখন ‘দুষ্টুচক্রের জালে’ আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ভরা মৌসুম হিসেবে খ্যাত কোরবারিনর সময় নানা অযুহাতে বছরের পর বছর চামড়ার দর পতন ঘটছে। এ কারণে চামড়ার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। একই কারণে কোরবানির চামড়ার দিকেও গুরুত্ব কমে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
যশোরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাট। ঢাকার পরে দেশের অন্যতম বৃহত্তর চামড়ার মোকাম এটি। এই মোকামে তিন শতাধিক আড়ৎ রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। এই হাট ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার ছোট বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে পরবর্তী একমাসের হাটগুলোতে রাজারহাটে লক্ষাধিক চামড়ার বেচাকেনা হয়ে থাকে।
রাজারহাট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই ট্যানারি মালিক, ঢাকার বড় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ‘সিন্ডিকেটের’ কারণে কোরবানি ঈদ পরবর্তী সময়ে চামড়ার ব্যাপক দর পতন হচ্ছে। এতে মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এবছর এই কথিত সিন্ডিকেটের সাথে নতুন কারসাজি হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘করোনা আর পক্স’! গরু লাম্পিস্কিন ডিজিজে আক্রান্ত ছিল দাবি করে ‘করোনা আর পক্স’ ট্যাগ লাগিয়ে বাতিল দেখিয়ে অনেক চামড়া পানির দামে বিক্রি হয়েছে। কোরবানি ঈদ পরবর্তী এক মাসে (২৭ জুন পর্যন্ত) রাজারহাটে সবচেয়ে ভাল ও বড় আকারের চামড়া ৯শ’ থেকে ১২শ’ টাকা, মাঝারি চামড়া ৬শ’ থেকে ৮শ’ টাকা এবং ছোট চামড়া ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে কথিত করোনা আক্রান্ত (লাম্পিস্কিন) চামড়া সেই দেড়শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকাতেই বিক্রি হয়েছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়া থেকে রাজারহাটে চামড়া বিক্রি করতে আসা কবিরুল ইসলাম কবির জানান, আগে ঢাকার ট্যানারি বা বাইরের অনেক ব্যবসায়ী আসতেন এবং সরাসরি চামড়া কিনতেন। এখন বাইরের ব্যবসায়ীরা খুবই কম আসছেন। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম চাপিয়ে রাখছেন। কারণ যারা চামড়া নিয়ে এসেছেন, তারা তো বিক্রি করেই যাবেন। যশোরের অভয়নগর থেকে রাজারহাটে চামড়া বিক্রি করতে এসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অশোক দাস অভিযোগ করেন, ট্যানারি মালিক বা বড় ব্যবসায়ীরা এখন স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী-আড়তদারদের কাছ থেকেই শুধু চামড়া কিনছে। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। সেখানে সরকারি দামের কোনো তোয়াক্কা নেই।
খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে রাজারহাটে চামড়া নিয়ে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বপন দাস। তিনি জানালেন, ‘আড়তদাররা বলছে, চামড়ার করোনা হয়েছে। আমরা তো করোনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু কেউ চামড়ার দামও বলছে না।’ মণিরামপুর উপজেলার ফকির রাস্তা এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে হাটে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বদেশ দাস জানালেন, গড়ে তিনি চামড়াগুলো ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকায় কিনেছেন। এখন আড়তদাররা দুশ’ টাকা দাম বলছে। ‘ল্যাম্পিন (লাম্পিস্কিন), করোনা, পক্স’ এইসব বলে চামড়া বাতিল বলছে।
এই ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছরই সরকার চামড়া দাম নির্ধারণ করে দেয়। সেই হিসেবে আশায় বুক বেঁধে তারা কোরবানির পশুর চামড়া কেনেন। কিন্তু হাটে এসে পুঁজি বাঁচে না। নানা অযুহাতে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম পানির দামে নিয়ে আসা হয়। এতে ধীরে ধীরে অনেকেই চামড়া বেচাকেনা থেকে সরে যাচ্ছেন। আর চামড়ার দাম না পাওয়ায় যারা কোরবানি দিচ্ছেন, তারা চামড়ার দিকে আর দৃষ্টি দিচ্ছেন না। ফলে কোরবানির সময়ই অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে চামড়া শিল্প।
তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করেন যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, হাটে ত্রুটিযুক্ত অনেক চামড়া আসছে। এবার হাটে অনেক লাম্পিস্কিন, পক্স আক্রান্ত গরুর চামড়া উঠেছে। মৌসুমী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই চামড়া না চিনেই বেশি দামে কিনেছেন। এতে তারা ধরা খেয়েছেন। আর ত্রুটিযুক্ত চামড়ার মেশিনে দিলেই ছিড়ে, ফেটে নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে এই চামড়ার দাম কম। তবে সরকার নির্ধারিত দামে চমড়া বেচাকেনা হয় না বলেও তিনি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সরকার সরকারের মতো করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু সরকার তো চামড়া কেনে না। চামড়া কেনে ট্যানারি মালিকরা। তাই তাদের (ট্যানারির) দামেই চামড়া কেনাবেনা হয়। এদিকে, চামড়ার ল্যাম্পিস্কিন ডিজিজের বক্তব্য মানতে নারাজ যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। তিনি জানান, যশোরের বিভিন্ন পশুহাট তিনি ঘুরেছেন। হাটে তিনি ল্যাম্পিস্কিন বা অন্যকোনো রোগে আক্রান্ত পশুও তেমন দেখেননি। এছাড়া পশু কেনার সময় সবাই দেখেশুনেই কেনেন। ফলে রোগাক্রান্ত পশু তো কেউ কোরবানি করবেন না। ফলে হাটে ল্যাম্পিস্কিন আক্রান্ত অনেক চামড়া এসেছে, এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটি মূলত চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে তিনি মনে করেন। যশোর শহরের খড়কি এলাকার ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, তারা ভাগে দেড়লাখ টাকা দিয়ে পশু কোরবানি করেছিলেন। তাদের সেই গরুর চামড়া কেউ কিনতেই আসেনি। ফলে পরে তিনি ওই চামড়া একটি মাদরাসায় দিয়ে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ, কোরবানির পশুর চামড়া বা চামড়া বিক্রির টাকা সবাই দান-সদকা করে দেন। কিন্তু সেটির যদি দাম না পাওয়া যায়, তাহলে তো কোরবানির পর চামড়ার ভাল রাখার ব্যাপারে কেউ দৃষ্টি দেবে না। বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ঈদ পরবর্তী এক মাস চামড়া বেচাকেনার ভরা মৌসুম। কিন্তু এবার সেই পরিমাণ চামড়া আমদানি হয়নি। আর আমদানি হওয়া চামড়ার মধ্যে ত্রুটিযুক্ত অনেক চামড়া রয়েছে। ফলে সেই চামড়ার বাজারে দাম নেই। আগে বাইরে থেকে অনেক ট্যানারি মালিক, বড় ব্যবসায়ীরা হাটে আসতেন। ফলে প্রতিযোগিতার কারণে দাম বাড়তো। এখন সেই হার অনেক কমে যাওয়ায় দাম থাকছে না। আর সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও সরকার তো চামড়া কেনে না। এ কারণে ওই দামে কেনাবেচা হয় না। এজন্য তিনি কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি প্রদানের দাবি করেন। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। এছাড়াও চামড়ার দরপতনের পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন। এর মধ্যে অন্যতম ঈদের আগে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া না পাওয়া। হাতে নগদ টাকা না থাকায় তারা ঠিকমত চামড়া কিনতে পারেন না। এছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে লবণসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধিও এই শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, প্রতি বছর রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী এক মাসের মধ্যে লক্ষাধিক চামড়া বেচাকেনা হয়ে থাকে। এবছর ২৭ জুন শনিবারের হাট পর্যন্ত ৩০ হাজারের মতো চামড়া হাটে এসেছে। যা অন্য বছরের তুলনায় তিন ভাগের একভাগ। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এবছর কোরবানি কম হয়েছে। এছাড়া মাদরাসা এতিমখানা থেকে অনেক চামড়া ফুলতলার একটি ট্যানারি সরাসরি সংগ্রহ করেছে। তারপরও এটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা স্বীকার করেন হাটে সরকার নির্ধারিত দাম চামড়া বেচাকেনা হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী আমরা বাজার মনিটরিং করি। সরকার নির্ধারিত বা ন্যায্য দামে বেচাকেনা করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকি। কিন্তু আমরা তো কাউকে বাধ্য করতে পারি না। তারপরও নানাভাবে আমরা চামড়া বাজারকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছি।
মন্তব্য করুন