শনিবার
১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখির বাসা

জাহাঙ্গীর হোসেন, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখির বাসা

এক সময়ের গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি ছিল বাবুই পাখি আর তাল-নারিকেল গাছে ঝুলতে থাকা দৃষ্টিনন্দন বাসা। কিন্তু বন উজার, নতুন করে বনায়নের অভাব, বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের সংকটে সেই চিত্র এখন ইতিহাস হতে চলেছে।নির্বিচারে তাল ও নারিকেল গাছ কেটে ফেলার কারণে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের মেঠো পথে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ে না। অথচ এই বাবুই পাখিই একসময় তাল ও নারিকেল গাছের পাতা, লম্বা শক্ত ঘাস দিয়ে নিজের নিপুণ ছোঁয়ায় বাসা বুনতো।

বাবুই পাখির বাসা শুধু সৌন্দর্যই ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের অংশ। এক সময় তাল গাছ থেকে তৈরি হতো নদী-খাল-বিলে মাছ ধরার নৌকা ও বাহন। তাল গাছের কদর থাকায় রাস্তার ধারে ও পতিত জায়গায় তাল গাছ লাগানো হতো।কিন্তু আধুনিকতার এই যুগে তাল গাছের নতুন করে আবাদ হচ্ছে না। কাটা পড়ছে গাছ। ফলে বাবুই পাখি বাসা বাঁধার জায়গাই পাচ্ছে না।

বিলুপ্তির পথে বাবুই পাখি ও তার বাসা বিলের ধারে বা গ্রামীণ সড়কের পাশে তালগাছ ঘিরেই তাদের বসবাস। একসময় বাবুই পাখির বাসা আর কিছিরমিছির কলবর জুড়েই থাকবো গ্রাম-বাংলার আবহমান জনপদ। তবে কালের বিবর্তনে আজ প্রায় বিলুপ্ত শিল্পের কারিগর এই বাবুই পাখি ও তার বাসা।

কবি বলেছেন- "বাবুই পাখিরে ডাকি’ বলিছে চড়াই,— কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই? আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে! বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তায়! কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়; পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও-বাসা; নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর—খাসা।

বাসা তৈরিতে যে এমন সুনিপুণ কারিগর সে তো শিল্পের বড়াই করতেই পারে। কিন্তু কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী 'স্বাধীনতার সুখ' কবিতাটির নায়ক আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। বাবুই পাখি সাধারণত তালপাতা, ঝাউ, খড়, ও কাশবনের লতাপাতা দিয়েই উঁচু তালগাছের ডালে বাসা তৈরি করে।

উঁচু তালগাছে বাঁধা খড়কুটোর সেই বাসা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও মজবুত হয় এবং প্রবল ঝড়ো বাতাসেও তা ঝরে পড়তো না। বাবুই পাখির শক্ত বুননের বাসা শিল্পের অনন্য সৃষ্টি। যা একজন মানুষের কাছে সহজে টেনে ছেঁড়া সম্ভব হত না। বাসা তৈরি ও জীবন প্রণালি: বাসা তৈরির শুরুতে বাসায় দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকলেও পরে একদিক বন্ধ করে বাবুই পাখিরা তাতে ডিম রাখার জায়গা তৈরি করে।

অপর দিকটি লম্বা করে তৈরি করে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ। প্রবাদ আছে বাবুই পাখি বাসা তৈরি করার পর সঙ্গী খুঁজতে যেত অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে পুরুষ বাবুই পাখি স্ত্রী বাবুই পাখিকে সঙ্গী বানানোর জন্য ভাব-ভালোবাসা নিবেদন করে এবং বাসা তৈরির কাজ অর্ধেক হতেই স্ত্রী বাবুইকে কাঙ্ক্ষিত বাসা দেখাতো। কারণ বাসা পছন্দ হলেই কেবল এদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকি কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুই পাখির সময় লাগে মাত্র চার থেকে পাঁচদিন। পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ ছয়টি বাসা তৈরি করতে পারে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণায় পুরুষ বাবুই পাখি মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন ভাবে বাসা তৈরির কাজ শেষ করতো। তবে প্রেমিক বাবুই পাখি যতই ভাব-ভালোবাসা প্রকাশ করুক না কেন, প্রেমিকা বাবুই পাখির ডিম দেওয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই পাখি আবার খুঁজতে থাকে অন্য সঙ্গী।

বাবুই পাখি সাধারণত খুটে খুটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। কালীগঞ্জ সহ দেশের গ্রামীণ জনপদগুলোতে প্রায় বিলুপ্তির পথে বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা। আগের মতো এখন আর প্রকৃতি প্রেমীদেরও চোখে পড়েনা বাবুই পাখি, চোখে পড়েনা বাবুই পাখির তৈরি দৃষ্টিনন্দন ছোট্ট বাসা ও বাসা তৈরির নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য।

একসময় প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে সারি সারি উঁচু তালগাছের পাতার সঙ্গে বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা দেখা যেত। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখি ও তাদের নিজের তৈরি বাসা আজ বিলুপ্তপ্রায়, কালের বিবর্তনে এখন তা আর সচরাচর চোখে পড়ে না।

ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডাঃ এএস এম আতিকুজ্জামান, বলেন, বাবুই পাখির বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের তাদের নিরাপদ বাসস্থান সংকট। তাল গাছকে ঘিরেই মূলত তারা বাসস্থান গড়ে তুলে। কিন্তু আগে আমরা যে পরিমাণ তালগাছ দেখতে পেতাম তা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। যার কারণে এ পাখিটি বাসস্থান গড়ে তুলতে পারছে না। অন্যান্য গাছে তারা বাসা তৈরি করলেও তা ক্ষণস্থায়ী। এ ছাড়া পাখির প্রধান খাদ্য ধান। ধানের ফসলি জমিতে বিষাক্ত কীটনাশক ও ফসল রক্ষা করতে যে জাল ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে পাখিটি মারা যাচ্ছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেধাবী তরুণদের জন্য সুযোগ ও অনুপ্রেরণার আহ্বান জাইমা রহমানের

কুয়েতে ইরানের হামলা, পানি শোধনাগারে ব্যাপক ক্ষতি

দক্ষিণ লেবাননে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ শুরু ইসরায়েলের

দিরাইয়ে অপহৃত কলেজছাত্রী উদ্ধার, প্রধান আসামি আইয়ুব নূর গ্রেপ্তার

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে বহিষ্কার: সোমনাথ দে

মৃত্যুর পর মাগুরায় ১০ বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

মহেশপুরে ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

ঝিকরগাছা ফায়ার স্টেশনের অ্যাম্বুলেন্স স্থানান্তরে ক্ষোভ, দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবি

যশোরে যুবদল নেতা রুবেল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সামিনুর গ্রেপ্তার

ঢাকাস্থ যশোর সাংবাদিক ফোরামের ফল উৎসব অনুষ্ঠিত

অভয়নগরে ভৈরব নদে গোসল করতে নেমে গৃহবধূ নিখোঁজ

চ্যাম্পিয়নশিপ রিং পাচ্ছে বিশ্বকাপজয়ী দল

ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে মঞ্চ ভেঙে পড়ল, অক্ষত অর্থমন্ত্রী

এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত: মাগুরা সেরা, রামেক তৃতীয়

মণিরামপুরে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ভেঙ্গে পড়া সড়ক ও ব্রীজ পরিদর্শনে এমপি এনামুল

৪৫ বছর পর পুনর্জীবন পেল কলাপাড়ার ঐতিহাসিক স্বনির্ভর খাল

বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ সহায়তার আশ্বাস অর্থমন্ত্রীর

যশোরে প্রয়াত বিএনপি নেতা নূর-উন-নবীর স্মরণে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত

যশোরে ৭৮ এতিম শিশুদের মাঝে খাদ্য, হাইজিন প্যাক ও নতুন পোশাক বিতরণ

বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটে রেকর্ড, সর্বোচ্চ কত?

X