
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হওয়ায় ইরানের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকলে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী এক দশকের মধ্যে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
চলমান বিশ্বকাপে ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স যেমন দেশটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে, তেমনি কূটনৈতিক অঙ্গনেও তেহরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তীতে অন্য দেশগুলো যেন ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্য করতে না পারে, সে জন্য চালু করা হয় তথাকথিত 'সেকেন্ডারি স্যাংশন'।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেন।
২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ৬০ দিনের জন্য ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দেয়। এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি ইরানি তেল কিনতে পারবে, ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে এবং আগে কালো তালিকাভুক্ত ট্যাংকার থেকেও তেল সংগ্রহের সুযোগ পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম এত বড় পরিসরে ইরানি তেলের ওপর বিধিনিষেধ কার্যত শিথিল হলো।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তেল নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। পরে ২০১০-এর দশকে আরও কঠোর 'সেকেন্ডারি স্যাংশন' আরোপ করা হয়, যাতে অন্য দেশগুলোকেও ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত রাখা হয়। ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সেগুলো আবার কার্যকর হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সিদ্ধান্ত আগের সব ছাড়ের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। এর মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানির বড় বাধাগুলো সাময়িকভাবে দূর হয়েছে এবং দেশটির জ্বালানি খাত নতুন করে গতি পেতে শুরু করেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে প্রায় স্থবির অবস্থায় থাকা ইরানের তেল রপ্তানি বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তবে যুদ্ধের আগে যে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি হতো, সেই পর্যায়ে ফিরতে এখনও সময় লাগবে।
তবে এবারের ছাড় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজে বোঝাই হয়ে থাকা তেল রপ্তানিতে ছাড় দিয়েছিল। ওবামা প্রশাসনের দেওয়া লাইসেন্সে শর্ত ছিল, তেল কেনা ধাপে ধাপে কমাতে হবে। ফলে ২০১১ সালে দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি পরের বছর কমে ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। ওবামার পারমাণবিক চুক্তিও কেবল পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞাগুলোই স্থগিত করেছিল। তবে তিন বছর পর সেই চুক্তি বাতিল করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কিন্তু ট্রাম্পের নতুন লাইসেন্সে এমন কোনো শর্ত নেই। মার্কিন শোধনাগারগুলো এখন সরাসরি পারস্যের পেট্রোলিয়াম কিনতে ও ডলারে তার দাম পরিশোধ করতে পারবে। এমনকি কালোতালিকাভুক্ত ট্যাংকার থেকেও তেল নেওয়া যাবে। এর ফলে ১৯৭৯ সালের প্রথম নিষেধাজ্ঞা অন্তত সাময়িকভাবে কার্যত স্থগিত হলো।
আলোচনায় ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় দেয়নি। তবু ওয়াশিংটন হঠাৎ এত উদার হলো কেন? এর একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মিশেল ব্রোহার্ড জানান, এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাবে বলে আশা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে চীন সস্তায় ইরানি তেল কেনার সুযোগ হারাবে এবং ইরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা থেকে বিরত থাকবে। তবে বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে। কারণ, জুনের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ শিথিল করায় দেশটি ইতোমধ্যে বেশি পরিমাণে তেল রপ্তানি করছে।
তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার ডেভিড ওয়েচ বলেন, মে মাসে যেখানে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত শূন্যের কোঠায় ছিল, সেখানে এখন তা দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তেহরানের প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল খারগ দ্বীপ থেকেও জাহাজে তেল বোঝাইয়ের হার বেড়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার লক্ষ্যেও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রত্যাশিত সুফল এখনো দেখা যায়নি। ১৭ জুন ট্রাম্প যখন ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন, তার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। তাতে চুক্তির পর ইরান ছাড়া অন্য দেশের জাহাজের চলাচল যেটুকু বেড়েছিল, তা দ্রুতই থেমে যায়। বিপরীতে ইরানের নিজস্ব জাহাজের চলাচল বাড়তেই থাকে।
তবে সার্বিকভাবে এখন হরমুজে জাহাজ চলাচল বাড়ছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনাও বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে আশঙ্কা রয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপ করতে পারে, যা এই পথে জাহাজ চলাচল কমিয়ে দেবে।
২২ জুন তেহরান জানিয়েছে, তারা এই নৌপথ ‘পরিচালনা’ করবে এবং জাহাজ চলাচল সমন্বয়ের জন্য একটি ‘টেলিফোন হটলাইন’ চালু করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে খুব বেশি সুফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইরানের জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ফলে দেশটির তেল রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া তেল মজুতাগার খালি হওয়ায় স্থবির উৎপাদনও আবার শুরু করা যাচ্ছে।
এছাড়া লজিস্টিক ও লেনদেনের জটিলতা কমে যাওয়ায় ইরানের তেল কোম্পানিগুলো এবং স্বাভাবিকভাবেই ইরান সরকার তেল বিক্রি করে আগের তুলনায় বেশি মুনাফা করতে পারছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে শুধু তেল রপ্তানিই নয়, ইরানের তেল মজুত কমছে, উৎপাদন বাড়ছে এবং পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনের ব্যয়ও কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রিতে দেশটি আগের তুলনায় বেশি মুনাফা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান নীতি যদি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকে এবং এর সঙ্গে অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত হওয়া, সম্ভাব্য ট্রানজিট ফি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তা যুক্ত হয়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন