
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপাল। দুই দেশই চায় উত্তরণের সময় ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হোক। এই অতিরিক্ত সময় চাওয়ার পেছনে নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং বৈশ্বিক সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ইকোসকের প্রেসিডেন্ট লোক বাহাদুর থাপা।
বক্তব্যে তিতুমীর বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত তিন বছর সময় কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কার্যকর উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তিনি জানান, বর্তমানে ১৪টি স্বল্পোন্নত দেশ বিভিন্ন ধাপে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এসব দেশের সফল উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
উপদেষ্টা বলেন, এলডিসি গ্রুপ টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এবং দোহা কর্মসূচির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। এই দুটি কাঠামো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই, সহনশীল উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু ও টেকসই উত্তরণের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।
তিতুমীর বলেন, আমরা যখন ২০৩০ সালের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছি, তখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হ্রাস, ডিজিটাল বৈষম্য এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের সীমিত সুযোগ—এসব বিষয় আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ শুধু ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নকেই ব্যাহত করছে না, বরং ২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশিসংখ্যক এলডিসিকে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের লক্ষ্যসহ দোহা কর্মসূচির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন—
প্রথমত, ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বল্পসুদে ঋণসহ অনুকূল অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় এনে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। এ জন্য অনুকূল অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধে স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য অর্থায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে সহজলভ্য, পূর্বানুমানযোগ্য এবং দেশগুলোর ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অভিযোজন, সহনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর জন্য প্রদত্ত সহায়তা হতে হবে অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত এবং সহজে প্রাপ্তিযোগ্য। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
চতুর্থত, সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাজার প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতা বাড়িয়ে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করতে হবে, যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো উদ্ভাবনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে।
মন্তব্য করুন