
ঝিনাইদহের একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান মোবারকগঞ্জ চিনিকল কে ঘিরে একসময় হাজার হাজার কৃষকের জীবন-জীবিকা চলতো।মিলের মাড়াই মৌসুম শুরু হলে কৃষকদের ঘরে ফিরত ব্যস্ততা, মাঠজুড়ে দেখা যেত সবুজ আখের সমারোহ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকি, কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ এবং আখ চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগের অভাবই এ অবস্থার অন্যতম কারণ। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, আগে চিনিকলের মাঠ কর্মকর্তারা নিয়মিত গ্রামে গ্রামে যেতেন। কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন, নতুন আখের জাত, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির নানা পরামর্শ দিতেন। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতো। বর্তমানে সেই কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
তাদের দাবি, মাঠ কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন না। নতুন কৃষককে আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগও আগের মতো নেই। ফলে অনেক কৃষক লাভজনক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে প্রতিবছরই আখের আবাদ কমেছে এবং চিনিকল ও পর্যাপ্ত আখ সংগ্রহ করতে পারছে না।
এর ফলে, আখের সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাড়াই মৌসুমের দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। যেখানে একসময় প্রায় চার মাস মিল চালু থাকত, সেখানে এখন ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই মাড়াই কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। এতে যেমন উৎপাদন কমছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন , শ্রমিক এবং মিল-নির্ভর ব্যবসায়ীরাও।
বিশেষ করে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার, কাষ্ঠভাঙ্গা ও রাখালগাছি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একসময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আখ চাষ হতো। মহিষাহাটি, পিরোজপুর, ঠিকডাঙ্গা, বাদুরগাছা, কাষ্ঠভাঙ্গা, গৌরীনাথপুর, সাদিকপুর ও সাতগাছিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা মিলত আখের সবুজ সমারোহ। এসব এলাকার শত শত কৃষক আখ চাষ করে সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছিলেন। মাড়াই মৌসুমে কৃষকদের ব্যস্ততা থাকত চোখে পড়ার মতো।
এছাড়া ঝিনাইদহ সদর, কোটচাঁদপুর, হরিণাকুণ্ডু, মহেশপুর, শৈলকুপা এবং যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নও ছিল মোবারকগঞ্জ চিনিকলের গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদন এলাকা। এসব অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলি ও ট্রাক ভর্তি আখ চিনিকলে সরবরাহ করা হতো।
ফারাশপুর গ্রামের আখ চাষী আবু সাঈদ বলেন প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ বিঘা করে আখ চাষ করতাম। অন্য ফসলের তুলনায় আখের দাম কম হওয়ায় আখ চাষ কমিয়ে দিয়েছি বর্তমানে ৪ বিঘা করে চাষ করি।
মোবারকগঞ্জ চিনিকলের অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মিল কর্তৃপক্ষের আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৮০০ একর। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়ে আখ চাষ হয়েছে ৪ হাজার ১০ একর, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
চিনিকলের জন্য কৃষকদের কাছ থেকে আখ সংগ্রহে ৪৬টি ক্রয়কেন্দ্র (সেন্টার) পরিচালনা করা হয়। এসব সেন্টারে আখ ক্রয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ৪৬ জন সেন্টার ইনচার্জ (সিআইসি) থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৮ জন।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা যদি আন্তরিকভাবে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতেন, নতুন আখ চাষিদের তৈরি করতেন এবং নিয়মিত তদারকি বাড়াতেন, তাহলে আখের আবাদ এতটা কমে যেত না। পাশাপাশি আখের ন্যায্য মূল্য, সময়মতো বিল পরিশোধ এবং আধুনিক চাষাবাদে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা আবার ও আখ চাষে আগ্রহী হতেন।
মোবারকগঞ্জ চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, মোবারকগঞ্জ চিনিকলের আওতায় আখচাষীদের সার্বিক সহযোগিতা ও তদারকির জন্য মোট ১০১টি ইউনিট রয়েছে। সাধারণত দুই থেকে তিন বা তারও বেশি গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিট গঠিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিটে একজন করে ফিল্ডম্যান (সিডিএ) দায়িত্ব পালন করার কথা।কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ১০১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৩৫ জন ফিল্ডম্যান (সিডিএ) মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে বিশাল এলাকায় সীমিত জনবল দিয়ে কৃষকদের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।এ কারণে অনেক আখচাষী সময়মতো পরামর্শ, আখের বীজ নির্বাচন, রোগবালাই দমন, চাষাবাদ পদ্ধতি ও অন্যান্য কারিগরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকির অভাবে নতুন করে আখ চাষে আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের জিএম(কৃষি) গৌতম কুমার মন্ডল বলেন , আসল কথা হচ্ছে সুগার মিলের অবস্থা আগের মত নাই। জনবল চাহিদা মত না থাকা। আখের দাম বৃদ্ধি না পাওয়া। স্বল্প মেয়াদী ফসলের লাভ বেশি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে কৃষক আখ চাষ।থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে আমরা কৃষক কে আখ চাষে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম সচেতনতামূলক মতবিনিময় করে চলেছি।
মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিঃ ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌঃ আ. ন. ম. জোবায়ের বলেন জনবল সংকট , অন্য ফসলের তুলনায় দাম কম হওয়া , জমির পরিমাণ খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়ার কারণে আখের চাষ কম হচ্ছে বলে তিনি দাবী করেন। এসব সমস্যার বিষয়গুলো উপর মহল কে জানানো হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, মোবারকগঞ্জ চিনিকল কে টিকিয়ে রাখতে হলে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নতুন আখ চাষি তৈরি, উন্নত জাতের আখের চারা সরবরাহ, প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং মাঠ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় আখের আবাদ আরও কমে গেলে ভবিষ্যতে চিনিকলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন
৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
৩০ জুন ২০২৬, ১০:১৮ পিএম