
আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা, ছাই কিংবা গ্যাস নির্গত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সেই আগ্নেয়গিরি যদি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সমমূল্যের স্বর্ণ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, অ্যান্টার্কটিকার মাউন্ট এরেবাস এমনই এক ব্যতিক্রমী আগ্নেয়গিরি, যেখান থেকে প্রতিদিন ক্ষুদ্র স্বর্ণের স্ফটিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯১ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাউন্ট এরেবাস পৃথিবীর অন্যতম বিরল আগ্নেয়গিরি, যা বিশুদ্ধ সোনার আণুবীক্ষণিক কণা নির্গত করে।
প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মাউন্ট এরেবাস থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ গ্রাম আণুবীক্ষণিক স্বর্ণের স্ফটিক বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, এই পরিমাণ স্বর্ণের মূল্য প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার। বছরে এর মূল্য ২০ লাখ ডলারেরও বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটির বেশি টাকা।
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন, এই স্বর্ণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণার আকারে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এগুলো সংগ্রহ করে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয়।
ভৌগোলিকভাবে মাউন্ট এরেবাস দক্ষিণ মেরু থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার দূরে রস সাগরের রস দ্বীপে অবস্থিত। আগ্নেয়গিরিটির লাভা থেকে অবিরাম আগ্নেয় গ্যাস নির্গত হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব গ্যাস বিশুদ্ধ সোনার আণুবীক্ষণিক কণা বহন করে, যা অ্যান্টার্কটিকার বরফে জমা হওয়ার আগে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে।
ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখেছেন, আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত সোনা সাধারণ ধূলিকণা নয়। কণাগুলো ক্ষুদ্র হলেও সুগঠিত স্ফটিকের আকার ধারণ করে। এর কোনো কোনোটির ব্যাস ৬০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরির গ্যাসে সোনার উপস্থিতি পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। হাওয়াইয়ের কিলাউয়া, ইতালির মাউন্ট এটনা, আলাস্কার অগাস্টিন আগ্নেয়গিরি এবং মেক্সিকোর এল চিচনসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি আগ্নেয়গিরিতেও অল্প পরিমাণে সোনার সন্ধান পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্লোরিন বা সালফারসমৃদ্ধ যৌগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গরম আগ্নেয় গ্যাসের মাধ্যমে সোনা ওপরের দিকে উঠে আসে। গ্যাস ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনা আলাদা হয়ে স্ফটিকে পরিণত হয়।
তবে মাউন্ট এরেবাস অন্য সব আগ্নেয়গিরির তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রম। এর এই বৈশিষ্ট্যের রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। গবেষকেরা এ বিষয়ে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্লোরিনসমৃদ্ধ আগ্নেয় গ্যাস বাতাসে ঠান্ডা হওয়ার সময় সেখান থেকেই সরাসরি সোনার স্ফটিক তৈরি হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। কারণ এসব গ্যাসে সোনার পরিমাণ অত্যন্ত কম।
আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী, সোনার স্ফটিক প্রথমে আগ্নেয়গিরির লাভার হ্রদের উপরিভাগে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। পরে আগ্নেয় গ্যাসের সঙ্গে তা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯১ সালে গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় এলেও তিন দশকেরও বেশি সময় পরও মাউন্ট এরেবাসের এই বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর একটি হিসেবে এখনও গবেষকদের কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকার মাউন্ট এরেবাস।
সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য করুন