
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বুকে এখন নতুন স্বপ্নের গুঞ্জন। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলীর বুক চিরে কালুরঘাট সেতু, বে টার্মিনালের বিশাল ক্যানভাস- সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চট্টগ্রামের জন্য যা এসেছে, তা এককথায় ঐতিহাসিক। ৪০টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে ১১ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। গতবার এটি ছিল ৯ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় বাড়ল ২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
বাজেট নথির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কাটছাঁট করে নামিয়ে আনা হয়েছিল ৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়। সেই সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় আগামী অর্থবছরে চট্টগ্রামের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ছে ৪ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
তবে সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়লেও চট্টগ্রামের প্রধান চার উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বড় তারতম্য। চট্টগ্রাম বন্দর ও ওয়াসা পেয়েছে বিপুল বরাদ্দ।
বড় ধাক্কা খেয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ফলে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট সংস্কার, সড়ক বাতি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবাগুলো অর্থসংকটে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পের কারণে এবারও বরাদ্দের সিংহভাগ পেয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ, যা প্রায় ৪ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। গতবার ৩ হাজার ৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বছর শেষে পেয়েছিল মাত্র ৯৪৬ কোটি টাকা। নগরীর স্যানিটেশন ব্যবস্থার মতো মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য ওয়াসাও পেয়েছে বড় অঙ্কের বরাদ্দ। গত বছরের ৮০৩ কোটি টাকার বিপরীতে এবার পেয়েছে ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যা গতবারের চেয়ে ৬০৬ কোটি টাকা বেশি।
জলাবদ্ধতা ও ফ্লাইওভারের মতো মেগা প্রকল্প এখন শেষ পর্যায়ে। ফলে বেশ কমেছে সিডিএ’র বরাদ্দ। ছয়টি প্রকল্পে গত বছর ১ হাজার ৭শ কোটি টাকা পেলেও সিডিএ এবার পেয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ গতবারের চেয়ে ৩৮৬ কোটি টাকা কম। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চসিক। পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটিতেই পায়নি কোনো বরাদ্দ। নগরীর রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও বাতি লাগানোর জন্য চসিকের বরাদ্দ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ৭০০ কোটি টাকার জায়গায় এবার চসিক পেয়েছে মাত্র ৩৮০ কোটি টাকা, যা গতবারের চেয়ে ৩২০ কোটি টাকা কম।
বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে বড় মেগা প্রকল্পগুলোয় এবার ঢালা হয়েছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। বেশি বরাদ্দ পাওয়া শীর্ষ প্রকল্পের একটি- মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (সওজ অংশ)। এই প্রকল্পের সড়ক ও জনপথ অংশের জন্যই রাখা হয়েছে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মূল অংশের কাজের জন্য রাখা হয়েছে ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাতারবাড়ী বন্দরের জন্যই মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।
কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগের উন্নয়নে চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। শিল্পায়নে গতি আনতে মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে রয়েছে ৮০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ, যা গতবারের চেয়ে ৭৪৭ কোটি টাকা বেশি। অবশ্য গতবছরের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী প্রকল্পটি বছর শেষে বরাদ্দ পেয়েছিল সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
সিডিএ’র বহুল আলোচিত জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পে এবার রাখা হয়েছে ৭৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ, যা চট্টগ্রামের নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর প্রধান ভরসা। ওয়াসার চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা (প্রথম পর্যায়) মেগা প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৭৬০ কোটি টাকা। কর্ণফুলি নদীর ওপর বহুল প্রতীক্ষিত কালুরঘাট সেতু নির্মাণে ৬৯৭ কোটি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৬৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বরাদ্দ যদি সত্যিই বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে শুধু চট্টগ্রাম নয়, বদলে যাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। কিন্তু গতবছর মাতারবাড়ীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ পেয়েছে ৩ হাজার কোটির বেশি, পেয়েছিল মাত্র ৯৪৬ কোটি। মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে বরাদ্দ ছিল ৫৭ কোটি টাকা, পেয়েছে সাড়ে চার কোটি।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বললেন, তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়া দিতে চান না। পুরো বাজেট পর্যবেক্ষণের পর পূর্ণাঙ্গ মতামত দেবেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রত্যয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঘোষিত এই বাজেটে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারা উল্লেখ করেন, বাজেটে করজাল সম্প্রসারণ, ডি-রেগুলেশনের মাধ্যমে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী পরিবেশ সৃষ্টি এবং রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনরায় উৎপাদনমুখী ধারায় ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং করদাতাদের হয়রানি কমানোর পরিকল্পনাকেও তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিডব্লিউসিসিআই) প্রেসিডেন্ট আবিদা সুলতানা বলেন, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত বার্ষিক আয়ের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের করের চাপ কমবে এবং তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন। এছাড়া বাজেটে এসএমই উদ্যোক্তা তহবিলে ২ হাজার কোটি টাকা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবকেও তিনি স্বাগত জানান।
বাজেটে অনেক পণ্যের কাঁচামালের ডিউটি কমিয়েছে উল্লেখ করে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আরও কিছু কাঁচামাল আছে যেগুলোর ডিউটি কমানো দরকার। তাহলে ফিনিশড প্রোডাক্টের ওপর ডিফারেন্স থাকলে আমাদের দেশে ভ্যালু এডিয়েশনটা বাড়বে। তিনি বলেন, রপ্তানি বহুমুখী করতে নতুন করে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হবে। রেডিমেড গার্মেন্টসের বাইরে নতুন নতুন রপ্তানি পণ্যের জন্য বন্ড লাইসেন্স দেবে। সামনের দিনে বাজার আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। তখন নতুন নতুন পণ্য রপ্তানির সুবিধার জন্য লাইসেন্স দরকার হবে। সরকার চায় এদের সবাইকে বন্ড লাইসেন্স দিতে। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট।
মন্তব্য করুন
৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম