
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা “অকল্পনীয় হারে” বৃদ্ধি করার নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার পিয়ংইয়ং একটি নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা উন্মোচন করেছে, যা পারমাণবিক বোমার জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নতুন স্থাপনাটি সম্ভবত একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। দক্ষিণ কোরিয়া-এর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-এর সঙ্গে সমন্বয় করে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ দাবি করেছে, নতুন স্থাপনায় উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির অবস্থান বা কার্যক্রম শুরুর সময় সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রকাশিত ছবিতে একটি বড় হলঘরে সারিবদ্ধভাবে সেন্ট্রিফিউজ দেখা গেছে, যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদনে সহায়তা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরো এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং এটি অঞ্চলজুড়ে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। নতুন এই কারখানার উন্মোচনটি কিমের বারবার করা প্রতিশ্রুতিরই অংশ, যেখানে তিনি ক্রমবর্ধমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক হুমকি মোকাবেলার জন্য তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলেছেন।
কেসিএনএ জানিয়েছে, কিম বুধবার এই পারমাণবিক স্থাপনাটি পরিদর্শন করেছেন এর কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে।
কেসিএনএ কিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুদের সঙ্গে সংঘাতের কারণে দেশের পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। এখানে স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বলা হয়েছে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিম উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে অন্যান্য অনির্দিষ্ট হুমকি ও সংকটের কথাও উল্লেখ করেছেন।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ জানিয়েছে, দেশটির নেতা কিমের দাবি, পাঁচ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপকরণ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে তার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কেসিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পরিদর্শনের পর কিম ও শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি বৈঠক করেন। সেখানে তিনি দেশের পারমাণবিক শক্তি দ্রুত বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণের কথা বলেন।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, কিম একটি সেন্ট্রিফিউজ হলের মতো স্থাপনায় ঘুরে দেখছেন। সেখানে সারিবদ্ধভাবে বসানো রুপালি রঙের নল ও পাইপের মাঝখান দিয়ে তিনি হাঁটছেন। অন্য একটি ছবিতে তাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যায়। বৈঠকের টেবিলে শঙ্কু আকৃতির একটি বস্তুর ঝাপসা চিত্রও ছিল। তবে সেটি কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেডের নকশা কি না, তা স্পষ্ট নয়।
নতুন এই স্থাপনার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আরেকটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র উন্মোচনের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে। এর আগে ২০১০ সালে উত্তর কোরিয়া প্রথমবারের মতো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সামনে ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক কমপ্লেক্সের একটি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র প্রদর্শন করেছিল।
২০২৪ সালে আগের কেন্দ্র পরিদর্শনের সময়ও কিম দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ‘অকল্পনীয়ভাবে’ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন তিনি আরো বেশি সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন এবং উন্নত প্রযুক্তির নতুন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির ওপর জোর দেন।
উত্তর কোরিয়া ২০১৭ সালের পর আর কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি। তবে গত কয়েক বছরে দেশটি দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি মার্কিন মূল ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে সক্ষম বলে মনে করা হয়। একই সঙ্গে নেতা কিম জং উন দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছেন।
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে তখন আনুমানিক ২০ থেকে ৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। তবে বর্তমানে কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, দেশটির অস্ত্রাগারে ১০০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। তাদের মতে, উত্তর কোরিয়া প্রতি বছর আরো ৬ থেকে ১৮টি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম, উভয় উপাদান দিয়েই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায়। উত্তর কোরিয়ার ইয়ংবিয়ন নিউক্লিয়ার সায়েন্টিফিক রিসার্চ সেন্টারে, এই দুই ধরনের উপাদান উৎপাদনের সুবিধা রয়েছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণে মনোযোগী হয়েছে। এরপর থেকে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আন্তর্জাতিক আহ্বানও তারা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে, চলতি বছরের এপ্রিলে রাফায়েল গ্রোসি জানান, তার সংস্থা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কার্যক্রমের ‘উল্লেখযোগ্য ও দ্রুত বৃদ্ধি’ লক্ষ করেছে। তার এই মন্তব্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
মন্তব্য করুন
৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম