
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। কয়েক মাস ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা, বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি এবং ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে।
যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা নিয়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো পক্ষই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মহলও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযমের আহ্বান জানালেও বাস্তবে সামরিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও কূটনৈতিক চাপ পাল্টাপাল্টি বাড়তে থাকায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও বাড়ছে সংঘাত ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াই শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেই প্রচেষ্টা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ দেখা দিলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আবারও তীব্র হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত করছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, ইরানের জলসীমা ও নিরাপত্তা উপেক্ষা করে বিদেশি শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে উভয় পক্ষই নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আরও গভীর হয়েছে। ইরানের বক্তব্য, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।
লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগাযোগের পথ। ফলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—এই দুই কৌশলগত জলপথ ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, নৌবাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নতুন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাব নতুন নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। চার বছরের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হুথিদের বক্তব্য, তাদের নিয়ন্ত্রিত সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিমান হামলার জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এ ধরনের হামলা নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনের সংঘাত আবারও বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক অঞ্চল নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
সৌদি আরব কি কৌশল বদলেছে? যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৌদি আরবের অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একসময় ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব এখন সরাসরি কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথ বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উত্তেজনা কমানোর আহ্বান, তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং চলমান সংঘাতে তুলনামূলক সংযত অবস্থান সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, ইরান ও তার মিত্রদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সরাসরি হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি যেমন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই রিয়াদ এখন সামরিক সংঘাতের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অতীতের অভিজ্ঞতাও প্রভাব ফেলছে সৌদি আরবের বর্তমান অবস্থানের পেছনে অতীতের কিছু অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০১৯ সালে আবকাইক তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এর ফলে সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, অথচ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে উপসাগরীয় দেশগুলোকে।
এই বাস্তবতা সৌদি আরবকে আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আরও সতর্ক করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভিশন ২০৩০ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইছে।
নিওমসহ শত শত বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হলে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে সৌদি আরব এখন আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বহুমুখী কূটনীতিতে রিয়াদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আগে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকলেও এখন রিয়াদ বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে সৌদি আরব। বিশেষ করে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে দূতাবাস পুনরায় চালু হওয়াকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কে কি দূরত্ব বাড়ছে? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কেও আগের মতো ঘনিষ্ঠতা নেই—এমন আলোচনা কূটনৈতিক মহলে রয়েছে। একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফর নিয়েও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করলেও সৌদি আরব তাঁর সফরসূচিতে ছিল না। যদিও পরে বাহরাইনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়, তবুও বিষয়টি কূটনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন বাস্তবতা সংঘাতের শুরুতে ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, সীমিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানকে চাপের মুখে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং প্রক্সি বাহিনীগুলোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুরোপুরি নিরাপদ করাও সম্ভব হয়নি।
মার্কিন প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ- একদিকে আরও বড় সামরিক অভিযান, অন্যদিকে নতুন করে কূটনৈতিক সমঝোতা। তবে উভয় পথই রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থাকলেও ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না ওয়াশিংটন। ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ অবরোধ জোরদার করতে ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। একই সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব হয়নি।
এর প্রধান কারণ ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও অপ্রতিসম সামরিক সক্ষমতা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-এটি শুধু দুটি দেশের সামরিক সংঘাত নয়; বরং কৌশলগত জলপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ। ফলে সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় কাক্সিক্ষত ফল পাচ্ছে না ওয়াশিংটন। যতদিন এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি পরিবহনের ব্যয় বাড়ায় বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়; উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়ছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে।
ট্রাম্পের বিকল্প ফুরিয়ে আসছে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও সংঘাত থামেনি। সমঝোতা স্মারক কার্যকর না হওয়ায় আবারও অবরোধ, বিমান হামলা এবং নৌ অভিযান শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান ছাড়া ইরানকে সামরিকভাবে পরাজিত করা কঠিন। আবার এমন যুদ্ধ শুরু করলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত সীমিত বিকল্পের মধ্যে আটকে পড়েছে। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, কৌশলগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বেরও কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক সমাধান কেন কঠিন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি, মধ্যস্থতা ও শান্তি আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত। উভয় পক্ষই নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ফলে কোনো পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এটি ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার। তেহরান মনে করে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে এই পথকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে চায়। এই মৌলিক মতপার্থক্যের কারণেই আলোচনার টেবিলে অগ্রগতি হচ্ছে না। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে চলমান সামরিক অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন অভিযান এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে নতুন হুমকি সংঘাতকে আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ফলে প্রতিটি সামরিক ঘটনার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে ভেঙে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় উভয় পক্ষই সামরিক চাপকে কূটনীতির চেয়ে বেশি কার্যকর মনে করছে। ফলে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কার্যকর সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। যতদিন এই অবস্থার পরিবর্তন না হবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিনই থেকে যাবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে? বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে সংঘাত, ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতির ভাঙন, সৌদি আরবের সতর্ক কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ এবং ইরানের পাল্টা অবস্থান- সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সংকট আরও জটিল হচ্ছে।
এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্যপণ্যের মূল্য, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং বাংলাদেশের মতো শ্রমশক্তি রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিও এই সংঘাতের অভিঘাত বহন করবে। এ কারণেই কূটনৈতিক উদ্যোগ যতই চলুক না কেন, বর্তমান বাস্তবতা বলছে- সহসা থামছে না মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। বরং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন পুরো বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
মন্তব্য করুন