বুধবার
২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

বেইজিং ছাড়ছেন চীনের তরুণরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৫ এএম
বেইজিং ছাড়ছেন চীনের তরুণরা

একসময় চীনের তরুণদের কাছে বেইজিং ছিল স্বপ্নপূরণের শহর। ভালো চাকরি, উজ্জ্বল ক্যারিয়ার, অর্থনৈতিক সাফল্য ও উন্নত জীবনের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা ছুটে আসতেন রাজধানীতে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, আবাসন সংকট, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এখন অনেক তরুণই ভাবছেন—বেইজিংয়ে থেকে সাফল্যের পেছনে ছোটা, নাকি অন্য কোনো শহরে গিয়ে তুলনামূলক স্বস্তির জীবন বেছে নেওয়া?

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বেইজিং থেকে পালানো’ হ্যাশট্যাগের জনপ্রিয়তা তরুণদের এই পরিবর্তিত মানসিকতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় যে শহরে আসাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, এখন সেই শহর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন অনেকে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেইজিং চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতীক। সাম্রাজ্যিক রাজধানী থেকে আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠা এই শহর দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। মধ্যযুগে পণ্ডিতরা সাম্রাজ্যিক পরীক্ষায় অংশ নিতে বেইজিংয়ে আসতেন। পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্নাতক, উদ্যোক্তা ও অভিবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কাজ ও নতুন সুযোগের সন্ধানে রাজধানীতে পাড়ি জমান।

২৯ বছর বয়সী ওয়াং লেই ছিলেন সেই স্বপ্নযাত্রীদেরই একজন। পাশের হেবেই প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াং ছোটবেলায় প্রথমবার বেইজিংয়ে এসে শহরটির বিশালত্বে মুগ্ধ হন। বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে প্রথমবার একটি আকাশচুম্বী ভবন দেখে বন্ধুকে বলেছিলেন, বড় হয়ে একদিন তিনি ওই ভবনের চূড়ায় দাঁড়াবেন।

২০২০ সালে সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই বেইজিংয়ে পাড়ি জমান ওয়াং। তিনি রিয়েল এস্টেট খাতে কাজ শুরু করেন, যে খাত তখনও চীনের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক ক্ষেত্র। তার আগে আসা লাখো মানুষের মতো ওয়াংও বিশ্বাস করতেন, কঠোর পরিশ্রম করলে একদিন সাফল্য ধরা দেবেই। কিন্তু ছয় বছর পর সেই বিশ্বাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

অভিবাসীদের শহর চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অভিবাসন। গত কয়েক দশকে শত শত কোটি মানুষ গ্রাম ও ছোট শহর ছেড়ে দ্রুত বিকাশমান বড় নগরগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের শ্রম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাই চীনের দীর্ঘ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রতীক বেইজিং। ১৯৯০ সালের পর শহরটির জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে দাঁড়িয়েছে। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা বহু মানুষের কাছে বেইজিংয়ের একটি ঠিকানা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই স্বপ্নের বাস্তবতা বদলেছে। চীনের অর্থনীতির একসময়কার দ্রুত প্রবৃদ্ধি এখন অনেক ধীর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসন খাতের সংকট, যা একসময় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। করোনাভাইরাস মহামারিও ব্যবসা ও ভোক্তাদের আস্থায় বড় আঘাত হানে।

যেসব পরিবার তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ আবাসনে বিনিয়োগ করেছিল, তারা বাড়ির দাম কমে যেতে দেখে নিজেদের আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আবিষ্কার করে। মহামারি ও এর পরবর্তী বিধিনিষেধও মানুষকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য আরও বেশি সঞ্চয়ী করে তোলে। খরচ কমে যায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত করে। আর এর প্রভাব পড়ে চাকরির বাজারে। বেইজিংয়ে বড় কিছু করার ওয়াংয়ের পরিকল্পনাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। ‘আবাসন বাজারের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। চাপ ছিল প্রচণ্ড। তাই আমি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই,’ তিনি বলেন।

এখন ওয়াং ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে একটি ছোট বারও পরিচালনা করছেন। এই কাজ তাকে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা দিলেও অর্থনৈতিক চাপ পুরোপুরি কমেনি। ‘আমার আশপাশের অনেক মানুষ-সহকর্মী ও বন্ধুরাও একই ধরনের চাপের মধ্যে আছে। তাদের বেতন আর খরচের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। ডেটিং, বাড়িভাড়া এবং মাঝেমধ্যে ভ্রমণের খরচ যোগ করলে আয় আর যথেষ্ট থাকে না,’ বলেন তিনি।

‘বেইজিং থেকে পালানো’ চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বেইজিং থেকে পালানো’ হ্যাশট্যাগের পোস্টগুলো ব্যাপক মনোযোগ পাচ্ছে। এসব পোস্টে তরুণরা রাজধানী ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরছেন। তাদের অনেকের কারণ একই অত্যন্ত ব্যয়বহুল আবাসন, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা। ওয়াংয়ের কাছেও বিষয়টি এখন ক্রমেই বাস্তবতার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি একই পরিমাণ অর্থ অন্য কোনো শহরে খরচ করি, তাহলে হয়তো আরও ভালো জীবনযাপন করতে পারব’। তবে বেইজিং ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ছাড়াকে অনেকেই ব্যর্থতা বা ‘সম্মান হারানো’ হিসেবে দেখেছেন।

তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেই ধারণা বদলাচ্ছে। তারা এমন এক জীবনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, যেখানে সাফল্য অর্জনের জন্য ব্যক্তিগত সময়, মানসিক শান্তি ও আর্থিক নিরাপত্তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়।

‘৯৯৬’ থেকে ‘তাং পিং’ বছরের পর বছর ধরে চীনে ‘৯৯৬’ কর্মসংস্কৃতি সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা-র মতো চীনের সফল উদ্যোক্তারাও একসময় কঠোর পরিশ্রমের এই সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলেছেন। চীনের বয়স্ক প্রজন্মের কাছে ‘চি কু’ বা ‘কষ্ট সহ্য করা’ ছিল টিকে থাকা ও সাফল্য অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠায় তরুণদের কাছে সেই হিসাব বদলেছে।

২০২১ সালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘তাং পিং’ বা ‘শুয়ে থাকা’ ধারণা। এর মাধ্যমে এমন এক জীবনদর্শনকে বোঝানো হয়, যেখানে তরুণরা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও নিরন্তর সাফল্যের দৌড় থেকে সরে এসে তুলনামূলক সহজ জীবন বেছে নিতে চান। অর্থাৎ, বেশি বেতন, বড় বাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদার পেছনে অবিরাম ছুটে চলার বদলে কম চাহিদা, কম চাপ এবং বেশি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া।

সাফল্যের সংজ্ঞাও কি বদলে যাচ্ছে? এই পরিবর্তিত চিন্তাধারা ওয়াংয়ের কাছেও ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তার কয়েকজন বন্ধু ইতোমধ্যে বেইজিং ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছেন। তাদের জীবনযাপন দেখে ওয়াংয়ের মনে হয়েছে, রাজধানীর বাইরে থাকা অনেকের জীবন তুলনামূলকভাবে কম চাপের এবং বেশি স্বস্তিদায়ক।

তবে ওয়াং মনে করেন না, বেইজিং ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাওয়া মানেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা। তার মতে, অনেক তরুণ এখনও কঠোর পরিশ্রম করতে চান। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়াও জরুরি।

ওয়াংয়ের কাছে বেইজিং ছেড়ে যাওয়া শৈশবের স্বপ্নকে ব্যর্থ বলে মেনে নেওয়া নয়; বরং সাফল্যের সংজ্ঞাকে নতুন করে ভাবা। ছোটবেলায় তিনি মনে করতেন, চীনের সবচেয়ে বড় শহরগুলোর শীর্ষে পৌঁছানোই সাফল্য। এখন তার কাছে সাফল্যের অর্থ হলো এমন একটি জায়গা খুঁজে পাওয়া, যেখানে স্বস্তির সঙ্গে বেঁচে থাকা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই একটি জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।

একসময় যে বেইজিং ছিল স্বপ্নপূরণের প্রতীক, সেই শহরই এখন চীনের তরুণদের সামনে নতুন এক প্রশ্ন তুলে ধরছে—সাফল্যের জন্য কতটা ত্যাগ করা উচিত, আর কখন নিজের জীবনের জন্য অন্য পথ বেছে নেওয়া প্রয়োজন?

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২ জুলাই : ইতিহাসে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা

আইফোন চার্জ দেওয়ার সময় যে ৪ ভুলে ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হতে পারে

বেইজিং ছাড়ছেন চীনের তরুণরা

জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে হামলা, বহু সেনা নিহতের দাবি ইরানের

জয়া আহসানের বদঅভ্যাস কী জানেন?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন মোড়

বাহরাইনে অ্যামাজনের ডেটা অবকাঠামো ধ্বংসের দাবি ইরানের

প্রবাসীদের ভোটাধিকার: / ওসিভি-এসডিআই প্রকল্প নিয়ে ইসির সভা বুধবার

বন্যার্তদের সহায়তায় রুনা লায়লার কনসার্ট, টিকিটের দাম কত?

সানাবিল ফাউন্ডেশন ও ডা. রউফের মানবিক উদ্যোগ / কৃত্রিম পায়ে উঠে দাঁড়ালেন আরও ছয় অসহায় ব্যক্তি

একমুঠো বাদাম বাঁচাতে পারে রোগব্যাধি থেকে

এনসিপি নেতা কাফির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মহেশপুরে সার ডিলারদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের মতবিনিময় সভা

মহেশপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে একজনের মৃত্যু

সংবাদ প্রকাশের পর মহেশপুরে মোবাইল কোর্টের অভিযানে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ধ্বংস

যশোরে স্বেচ্ছাসেবক দলের জনসভা সফল করতে অভয়নগরে প্রস্তুতি সভা

কচুয়ায় শিক্ষক আতাউর রহমানের বিদায় সংবর্ধনা

নব জাগরণ সমাজ কল্যাণের উদ্যোগে মোরেলগঞ্জে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সমাবেশ অনুষ্ঠিত

ঝিকরগাছায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের গণসমাবেশ সফল করতে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

ছানিমুক্ত পানিসারা ইউনিয়ন গঠনে ঝিকরগাছায় পরিকল্পনা সভা

X