
সফর মাসকে ঘিরে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই মাস অশুভ এবং এ সময় বিয়ে, ব্যবসা বা নতুন কোনো কাজ শুরু করলে অমঙ্গল ঘটতে পারে। তবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুযায়ী এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্টভাবে বলেছেন, "কোনো মাসই অশুভ নয়, রোগের সংক্রমণ নিজে থেকে হয় না এবং পেঁচাকে অশুভ মনে করা যাবে না।" (সহিহ বুখারি: ৫৭০৭)
ইসলাম মানুষকে সময়, দিন বা মাসকে নয়; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনের জীবন পরিচালিত হবে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে। তাই কোনো মাসকে অমঙ্গলজনক মনে করা ইসলামের আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। (সুরা তাগাবুন: ১১)
অতএব বিপদ-আপদ বা সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য কোনো নির্দিষ্ট মাসের কারণে আসে—এমন বিশ্বাস ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
সমাজে প্রচলিত আরেকটি ধারণা হলো সফর মাসে বিয়ে করা উচিত নয়। অথচ কোরআন কিংবা সহিহ হাদিসে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বছরের যেকোনো সময় বৈধভাবে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়।
ইসলামের ইতিহাসেও দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এই কুসংস্কারের অসারতা প্রমাণ করে।
অনেক মানুষ সফর মাসে বিপদ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে তাবিজ-কবজ ব্যবহার করেন। কিন্তু ইসলামে বিশ্বাস করা হয়, আল্লাহ ছাড়া কোনো বস্তু বা ব্যক্তি নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে না। তাই এ ধরনের বিশ্বাস থেকে মুসলমানদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সফর মাসের শেষ বুধবারকে কেন্দ্র করে 'আখেরি চাহার সোম্বা' পালন অনেক স্থানে প্রচলিত। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এ দিনকে বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালনের কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এ ধরনের আমলের প্রচলন ছিল না।
তবে সফর মাসসহ বছরের যেকোনো সময় মুসলমানরা বিভিন্ন নেক আমল করতে পারেন। নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া, দান-সদকা এবং নফল ইবাদত একজন মুমিনের জন্য কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা (আইয়ামে বিজ), সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখা এসব আমল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
সফর মাস ইসলামের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় যাত্রার প্রস্তুতি। * দ্বিতীয় হিজরিতে আবওয়া অভিযান। * সপ্তম হিজরিতে খায়বর বিজয়। * খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ও আমর ইবনে আস (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ। * দ্বিতীয় হিজরিতে হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহ।
এসব ঐতিহাসিক ঘটনা স্পষ্ট করে যে, সফর মাস কোনো অশুভ সময় নয়; বরং ইসলামের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস।
ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। কোনো মাস, দিন বা সময় নিজস্বভাবে অশুভ নয়। মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয় আল্লাহর ইচ্ছা, তার আমল এবং ঈমানের ভিত্তিতে। তাই সফর মাসকে ভয় বা অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং ইবাদত, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।
মন্তব্য করুন